Sunday, 1 January 2012

আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি : নিষ্পেষিত মানবাধিকার








নাছির উদ্দিন শোয়েব
ক্রসফায়ার, গুপ্তহত্যা, নৃশংস খুন ও গুমসহ সহিংস ঘটনায় মহাজোট সরকারের তিন বছরে আইনশৃঙ্খলা এবং মানবাধিকার পরিস্থিতি ছিল চরম উদ্বেগজনক। র্যাব ও পুলিশের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। এর মধ্যে কয়েকটি ঘটনার ওপর বিচার বিভাগীয় তদন্ত চলছে। নির্যাতিত এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো আদালত এবং প্রশাসনের কাছে গিয়েও ন্যায়বিচার পায়নি—এমন বহু অভিযোগ রয়েছে। পেশাদার খুনি, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও বহু দাগি অপরাধীকে দলীয় বিবেচনায় আইনের আওতায় আনা হয়নি। বরং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামিকে কারাগার থেকে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, জনপ্রতিনিধিদের প্রকাশ্যে হত্যা, বিরোধী মতের ব্যক্তিদের নামে মিথ্যা মামলা, আটকের পর রিমান্ড এবং সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। ভঙ্গুর আইনশৃঙ্খলার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি।
মহাজোট সরকারের তিন বছরের প্রথম আড়াই বছর র্যাবের ক্রসফায়ার ও এনকাউন্টার চলে ফ্রিস্টাইলে। এতে স্থানীয় গণমাধ্যম ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনার মুখে চলতি বছরের শেষার্ধে নাম বদল করে নতুন কায়দায় শুরু হয় গুম-গুপ্তহত্যা। বিভিন্ন স্থান থেকে সাদা পোশাকধারীদের হাতে আটক প্রায় ১শ’ জনের খোঁজ মেলেনি। রাজধানী ঢাকাতেই চলতি বছর গুম হয়েছেন ৩০ জন। এ পর্যন্ত ১৬ জনের লাশ নদী, হাওর ও জঙ্গল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। বিএনপি নেতা ও ৫৬ নং ওয়ার্ড কমিশনার চৌধুরী আলমের কোনো হদিস নেই দু’বছরেও। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগের আঙুল র্যাবের বিরুদ্ধেই।
আওয়ামী লীগ বিরোধী দলে থাকাকালে ক্রসফায়ারের কঠোর বিরোধিতা করলেও ক্ষমতায় এসে এর সমর্থন করে। চলতি বছরের ২৩ মার্চ ঝালকাঠির রাজাপুরে তালিকাভুক্ত এক সন্ত্রাসীকে ধরতে গিয়ে র্যাবের গুলিতে নিরীহ কলেজছাত্র লিমন হোসেন আহত ও পঙ্গু হয়। এ ঘটনায় র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং গঠিত চারটি তদন্ত রিপোর্টে স্ববিরোধী তথ্য পাওয়া যায়। এখনও ইমনের মামলা নিষ্পত্তি হয়নি। পঙ্গু অবস্থায় তাকে র্যাবের মামলায় আদালতে হাজিরা দিতে হচ্ছে।
ক্রসফায়ারের ঘটনায় উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়া এবং কয়েকটি ঘটনায় আদালতে রিট করার পর র্যাব সদর দফতর থেকে বিজ্ঞপ্তি পাঠিয়ে ক্রসফায়ারকে ‘এনকাউন্টার’ বলে প্রচার চালানো হয়। কিন্তু নাম ভিন্ন হলেও র্যাব সদস্যরা নানা কায়দায় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অব্যাহত রাখলে মানবাধিকার সংগঠনগুলো এর কঠোরভাবে বিরোধিতা করে। ফলে ক্রসফায়ারের পাশাপাশি ২০০৯ সালের দিকে কৌশল বদলে র্যাব ও পুলিশ সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটকের পর হাঁটুতে গুলি করে আহত করার রীতি চালু করে। এ ঘটনায়ও ব্যাপক অভিযোগ ওঠে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে যে, সন্দেহজনক ব্যক্তিকে আটক করে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে চোখ বেঁধে হাঁটুতে গুলি করে আহত করে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। পর্যবেক্ষক মহল বলছে, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, গুপ্তহত্যা, সামারি বাণিজ্য ও বন্দুকযুদ্ধের নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের মতো বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে র্যাবের প্রশ্নবিদ্ধ ইমেজ আরও ম্লান হয়ে পড়ছে। র্যাবের বহু সদস্যও জড়িয়ে পড়েছে নানা অপরাধে। র্যাবের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১০ সালেই নানা অপরাধে জড়িত ৭৫৬ জন র্যাব সদস্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় বিভিন্ন পদমর্যাদার কমপক্ষে ৩১৪ সদস্যকে গুরুদণ্ড, ৩১০ জন লঘুদণ্ড ও স্ব-স্ব্ব বাহিনীতে ফেরত পাঠানো হয়েছে ১৩২ জনকে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী ২০০৯, ২০১০ ও চলতি বছরের (২০১১) নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় তিন বছরে (৩৫ মাসে) ৩৫৯ জন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে নিহত হন। এর মধ্যে রয়েছেন ২০০৯ সালে ১৫৪ জন, ২০১০ সালে ১২৭ জন ও ২০১১ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ৭৮ জন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০০৪ সালে র্যাবের যাত্রা শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত র্যাবের বিরুদ্ধে ৭০০ লোককে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। অতীতে এসব হত্যার ব্যাপারে র্যাব অথবা সরকার গঠিত বিচার বিভাগীয় কমিটি তদন্ত করেছে। তবে সেসব তদন্তের তথ্য এখনও প্রকাশ করা হয়নি বা গোপনই থেকে গেছে।
তবে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল বলেছেন, র্যাব কাউকে আটক করে নিয়ে নিখোঁজ বা গুম করেছে কেউ এ ধরনের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারবে না। দুষ্কৃতকারীরা র্যাবের নাম ভাঙিয়ে এ কাজ করতে পারে। তবে এ ধরনের অপরাধীদের আটকের জন্য র্যাব গোয়েন্দারা জোরালো চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও জানান কমান্ডার সোহায়েল। তিনি বলেন, র্যাব অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য অক্লান্ত চেষ্টা চালাচ্ছে। একটি এলিট ফোর্সের নামে এ ধরনের অপপ্রচার হলে অপরাধীরা সুযোগ নিতে পারে বলেও মন্তব্য করেন র্যাবের এ প্রভাবশালী কর্মকর্তা। র্যাবের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, র্যাব প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫৩৪টি অভিযানের মাধ্যমে ৬৫১ অপহৃতকে উদ্ধার এবং ৯৪২ অপহরণকারীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৪২৯টি মামলা হয়েছে।
একই সময় পুলিশের বিরুদ্ধেও ছিল বিস্তর অভিযোগ। হরতাল চলাকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুকের ওপর পুলিশের নির্মম নির্যাতন, গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হাতে আটক হয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী এমইউ আহমেদের মর্মান্তিক মৃত্যু, বিএনপি নেতা ও ডিসিসির সদ্য বিদায়ী মেয়র সাদেক হোসেন খোকাকে পুলিশের সামনে দুর্বৃত্তদের ছুরিকাঘাত, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে আটক করে অন্ধকার প্রকোষ্ঠে রেখে নির্মম নির্যাতন ও বস্ত্রহীন করার ঘটনা ছিল সবচেয়ে ন্যক্কারজনক। যা এদেশের গণমাধ্যমের জন্য চরম উদ্বেগজনক ঘটনা। এছাড়াও রাজনৈতিক নেতাদের আটকের পর রিমান্ডে নিয়ে নির্মম নির্যাতনের ঘটনাও ছিল আলোচিত।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহু ঘটনা দেশজুড়ে আলোচিত হয়। চলতি বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবদুল কাদেরকে ধরে নিয়ে খিলগাঁও থানায় আটক রেখে অপরাধী বলে নির্যাতন করে পুলিশ। এ ঘটনায় বিচার বিভাগীয় ও পুলিশি তদন্তে খিলগাঁও থানার ওসিসহ তিনজনকে দোষী সাব্যস্ত এবং আদালতের নির্দেশে তিন পুলিশ কর্মকর্তাকে সাসপেন্ড করা হয়। অপরদিকে গত শবেবরাতের রাতে সাভারের আমিনবাজারে পুলিশের মদতে ৬ ছাত্রকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করার ঘটনায় বিচার বিভাগীয় তদন্তে সাভার থানার ওসি মাহবুবুর রহমানকে প্রত্যাহার ও এসআই হারেস শিকদার এবং আনোয়ারকে সাসপেন্ড করা হয়। চলতি বছর নোয়াখালীতে এক যুবককে আটক করে পুলিশ বিক্ষুব্ধ জনতার মাঝে ছেড়ে দিয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যায় মদত দেয়। অন্যদিকে চট্টগ্রামে এক কলেজছাত্রীকে ধর্ষণের চেষ্টা করে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা থানার ওসি মিজানুর রহমান। এপ্রিল মাসে রাজশাহী আদালতে আসামির হাত ভেঙে দেয় পুলিশ কনস্টেবল নজরুল। রাজধানীর চৌধুরীপাড়ায় একটি আবাসিক হোটেলে তরুণীকে আটকে রেখে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা ভিন্নদিকে নেয়ার চেষ্টার অভিযোগে রামপুরা থানার ওসি এবং দুই সাব-ইন্সপেক্টরসহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করা হয়।
এদিকে নরসিংদীর নির্বাচিত জনপ্রিয় মেয়র লোকমান হোসেনকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যার অভিযোগ ওঠে খোদ সরকারেরই ডাক ও টেলিযোগাযোগমন্ত্রী রাজিউদ্দিন আহমেদের প্রতি। নিহত লোকমানের স্বজনদের দাবি, মন্ত্রীর নির্দেশেই তার ভাই সালাহউদ্দিন আহমেদ বাচ্চু ও আওয়ামী লীগ ক্যাডাররা মেয়র লোকমানকে হত্যা করে। এ ঘটনায় মামলার প্রধান আসামি মন্ত্রীর ভাইকে এখন পর্যন্ত পুলিশ গ্রেফতার করেনি। ‘সময়ের অভাবে আসামি ধরা যায়নি’ উল্লেখ করে আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের দেয়া বক্তব্যে আত্মীয়স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
এদিকে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক এখতিয়ারকে ব্যবহার করে নাটোরের চাঞ্চল্যকর গামা হত্যা মামলায় ২০ ফাঁসির আসামিকে ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে। ক্ষমা করে দেয়া হয়েছে লক্ষ্মীপুরে অ্যাডভোকেট নুরুল ইসলাম হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি বিপ্লবকে। জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও আইনজীবী আবদুর রাজ্জাক হত্যা মামলার ফাঁসির আসামি উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি আহসান হাবীব ওরফে টিটুকেও ক্ষমা করে দেয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর তিন বছরে দেশে ১২ হাজারেরও বেশি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। সে অনুযায়ী প্রতিদিন প্রায় ১১ জন করে খুন হয়েছেন। রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৫৯২ জন এবং আহত হয়েছেন ৪০ হাজার ১৯০ জন। চলতি বছর ইউপি নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৮৩ জন। তবে পুলিশ সদর দফতরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ১০ হাজার ৬শ’ উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ৪২১৯ জন ও ২০১০ সালে ৪৩১৫ জন। খুনসহ ডাকাতি, দুর্ধর্ষ চুরি, অপহরণ, নারী নির্যাতন, শিশু নির্যাতন, মাদক কেনাবেচাসহ ৫ লাখেরও বেশি অপরাধের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ২০০৯ সালে ১ লাখ ৫৭ হাজার ১০৮টি, ২০১০ সালে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৫৩৪টি ও চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে ১ লাখ ৩৭ হাজার অপরাধের ঘটনা ঘটে। গত তিন বছরে শুধু রাজধানী ঢাকায় ৫ হাজার ৫৭৬টি বেওয়ারিশ লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।
মানবাধিকার সংস্থা অধিকার-এর তথ্য অনুযায়ী, সরকারের ২ বছর ১১ মাসে ৪ সাংবাদিক নিহত, ২৮০ সাংবাদিক আহত, ৮৮ জন লাঞ্ছিত ও ৯৫ জন হুমকির সম্মুখীন হয়েছেন। পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে ৪০ সাংবাদিকের ওপর হামলা, দৈনিক আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানসহ ৩ জনকে গ্রেফতার, ১ জন অপহৃত ও ২৬ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়।
আলোচিত আরও খুন : আলোচিত হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ঢাকায় সংসদ ভবন এলাকায় যুবলীগ নেতা ইব্রাহীম হত্যা, যাত্রাবাড়ীতে ব্যবসায়ী দম্পতিসহ ট্রিপল মার্ডার, গুলশানে বাসায় ঢুকে মা ও মেয়েকে গুলি করে হত্যা, মগবাজারে যুবলীগ নেতা ইউসুফ আলী সরদার হত্যা, খিলগাঁওয়ে প্রকৌশলী হত্যা, মহাখালীতে কর্মচারী নেতা সিদ্দিকুর রহমান ও খিলগাঁওয়ে গৃহবধূ কণিকা হত্যা, মিরপুরে ইডেন কলেজের ছাত্রী মেনকা ও স্বর্ণ ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান হত্যাকাণ্ড নগরবাসীর মাঝে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। যুবদলের ঢাকা মহানগর (দক্ষিণ) সভাপতি ও ৭০ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার হাজী আহমেদ হোসেন, ক্যান্টনমেন্টের মানিকদি এলাকায় ছাত্রলীগ নেতা ফারুক, কারওয়ানবাজারে দিনদুপুরে গুলি করে ৩ ব্যবসায়ী, মোহাম্মদপুরে অপহরণের পর গুলি করে বিএনপি নেতা শিপু, ধনিয়া কলেজের ছাত্র আমজাদ হোসেন, সবুজবাগে ওসমান গণি ও গৃহবধূ শাহিনুর বেগম, পুরনো ঢাকায় ৪০ লাখ টাকা চাঁদা না পেয়ে দুর্বৃত্তদের গুলিতে জুয়েলারি ব্যবসায়ী প্রেমকৃষ্ণ রায়, গুলশানের কালাচাঁদপুরে নিজ বাড়িতে নার্সারি ব্যবসায়ী সাদেকুর রহমান ও তার স্ত্রী রোমানা নার্গিস, পুরনো ঢাকার কোতোয়ালি থানার সাব ইন্সপেক্টর গৌতম, মগবাজারে টেন্ডার বিরোধে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের হামলায় যুবলীগ নেতা ইউসুফ আলী সরদার, বনানীতে ছিনতাইকারীদের গুলিতে পুলিশের এসআই, গুলশানে মানিচেঞ্জ ব্যবসায়ী ফারুক আহম্মদ এবং তেজতুরীবাজারে স্কুলছাত্র রুবেল আহমেদকে হত্যা করা হয়। পুরনো ঢাকায় ডিশ ব্যবসায়ী আজগরকে হত্যা করে লাশ ১৫ টুকরা করে সন্ত্রাসীরা। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সন্ত্রাসীদের হামলায় সাবেক ইউনিয়ন চেয়ারম্যান জিল্লুর রহমান ও হোসেন মিয়া মারা যান। এছাড়াও লালমনিরহাটে বিএনপি নেতা ও ইউপি সদস্য রফিকুল ইসলাম, বড়াইগ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম বাবু, নাটোরে কলেজশিক্ষক মিজানুর রহমান, রূপগঞ্জে জামাল উদ্দিন, কুষ্টিয়া-১ আসনের আওয়ামী লীগদলীয় এমপি আফাজউদ্দিন আহম্মেদের বাড়িতে বোমা বিস্ফোরণে ৩ জন নিহত হয়।
অন্যদিকে ২০০৯ সালের উল্লেখযোগ্য খুনের মধ্যে যাত্রাবাড়ীতে মা ও তার ২ মেয়ে, ফকিরাপুলবাজারের সামনে ৩২নং ওয়ার্ড যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সালাউদ্দিন সুমন, মতিঝিলে মুক্তিযোদ্ধা ও ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক, সিভিল এভিয়েশনের নিরাপত্তা কর্মী আসাদুজ্জামান, মিরপুরে একটি পেট্রল পাম্পের হিসাবরক্ষককে গুলি করে পৌনে ৮ লাখ টাকা ছিনতাই, বাড্ডায় ব্যবসায়ী দেলোয়ার হোসেনের শ্বশুর মোবারক আলী, খিলগাঁও আইডিয়াল সিটি কলেজের ভাইস প্রিন্সিপাল চন্দন চক্রবর্তী ওরফে সাজ্জাদ হোসেন এবং ধলপুরে অ্যাডভোকেট শামসুল হক রিন্টুকে উপর্যুপরি ছুরিকাঘাত করে হত্যা করা হয়।
ইভটিজিং ও নারীর প্রতি সহিংসতা : পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, গত তিন বছরে ইভটিজিংয়ের ঘটনায় আত্মহত্যা করেছে ১৫০ জন। ২০১০ সালে ইভটিজিংয়ের শিকার হয়ে ২৮ নারী আত্মহত্যা করেছে। প্রতিবাদ করতে গিয়ে ৮ অভিভাবক খুন হয়েছেন এবং বখাটেদের হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে গিয়ে নিহত হয়েছেন ১৮ তরুণী। র্যাবের হিসাবমতে, গত এক বছরেই ইভটিজিংয়ের শিকার হয়েছে ১৩৮ কিশোরী ও তরুণী এবং গ্রেফতার হয়েছে ১২৬ জন। ২০১০ সালে দেশে ইভটিজিংয়ের ঘটনায় খুন-খারাবি, অভিভাবকের ওপর হামলা ও তরুণীদের হাত-পা কেটে নেয়ার মতো লোমহর্ষক ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। প্রতিবাদকারীরাও রোষানলে পড়েন। বখাটেদের হামলায় নাটোরের কলেজশিক্ষক মিজানুর রহমান এবং ফরিদপুরে এক কিশোরীর মা চাঁপা রানী ভৌমিকের মৃত্যু তোলপাড় সৃষ্টি করে। অপরাধ দমনে র্যাব-পুলিশ ও গোয়েন্দাদের মাঠে নামানো হয়। পরে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ভ্রাম্যমাণ আদালত গঠন করে সারাদেশে এ অপরাধ প্রতিরোধ করার কার্যক্রম চালু করা হয়।
সহিংসতা : ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জে বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সভাস্থলে ট্রেনে কাটা পড়ে পাঁচজনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। যমুনা সেতুর পশ্চিম সংযোগ সড়কের মুলিবাড়ী রেলওয়ে ক্রসিং-সংলগ্ন এলাকায় এ দুর্ঘটনায় আহত হয় প্রায় অর্ধশতাধিক। নিহতরা বিএনপির কর্মী ও সমর্থক। এ ঘটনায় পুলিশ ও বিএনপির নেতাকর্মীদের ব্যাপক সংঘর্ষও হয়। পুলিশ মিছিলে গুলি ছোড়ে। বিক্ষুব্ধ জনতা ট্রেনটিতে অগ্নিসংযোগ করে। এ ঘটনাকে বিএনপি পরিকল্পিত বলে অভিযোগ করেছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সেনা আবাসন প্রকল্পের নাম করে কম দামে জমি কেনা ও জমি দখল নিয়ে গ্রামবাসীর সঙ্গে সেনা ও পুলিশের সংঘর্ষের সময় মোস্তফা জামাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। বছরের প্রথম দিকে ফেব্রুয়ারিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আওয়ামী লীগ সমর্থিত ছাত্রলীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু বকর খুন হয়। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষে উভয়পক্ষ রামদা, চাপাতি, লাঠি, হকিস্টিক নিয়ে একে অপরের ওপর হামলা চালায়।
চাঁদাবাজি : গত তিন বছরে দেশজুড়ে ছিল চাঁদাবাজির মহোত্সব। চাঁদাবাজি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ব্যবসায়ী, পেশাজীবী, শিক্ষক, চাকরিজীবী, শ্রমজীবী, খেটে খাওয়া মানুষ কেউই নিস্তার পায়নি। সমাজের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে শুরু করে পেটের দায়ে রাস্তায় দাঁড়ানো ভাসমান পতিতা পর্যন্ত সবাইকে চাঁদা দিতে হচ্ছে। চাঁদাবাজির অভিযোগে চলতি বছর নভেম্বর মাসে রাজধানীর সোবহানবাগ এলাকা থেকে মদ্যপ অবস্থায় আওয়ামী লীগ নেতা হারুনুর রশিদ ওরফে তৈমুরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তৈমুর রাজধানীর ৫১ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ প্রচার সম্পাদক ছিলেন। তার বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির ৫টি মামলা রয়েছে।
টেন্ডারবাজি : মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ছাত্রলীগের টেন্ডারবাজি ও ভর্তিবাণিজ্য নিয়ে হানাহানিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো অশান্ত হয়ে পড়ে। ছাত্রলীগের সশস্ত্র মহড়া, অস্ত্রবাজির ঘটনা বলতে গেলে ওপেন সিক্রেট। ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা ও ক্যাডার ব্যাপক টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজির দায়ে অভিযুক্ত হয়। একপর্যায়ে এদের কর্মকাণ্ড এতটাই মাত্রা ছাড়িয়ে যায় যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী বিরক্ত হয়ে ছাত্রলীগের সঙ্গে সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিন্ন করার মৌখিক ঘোষণা দেন।
পুলিশ সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলন করে হুশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছিলেন, যেসব এলাকায় টেন্ডারবাজি ঘটছে, সেসব স্থানে পুলিশ যথাযথ ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট এসপি ও ওসির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে। টেন্ডারবাজিতে জড়িতদের ছাড় দেয়া হবে না বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যাডভোকেট সাহারা খাতুনের এমন হুঙ্কারেও সরকারি দলের ক্যাডারদের বেপরোয়া টেন্ডারবাজি ঠেকাতে প্রশাসনও ব্যর্থ হয়।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুপ্তহত্যা প্রসঙ্গে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, দেশ এভাবে চলতে পারে না। গুপ্তহত্যা ও গুম র্যাব-পুলিশ না করে থাকলে তবে কারা করছে, তাও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্পষ্ট করা উচিত। তিনি বলেন, পুলিশকে সরকারের লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে পরিচালিত হতে দেয়া যায় না। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে সরকারকেই জবাবদিহি করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। আইনশৃঙ্খলার অবনতি প্রসঙ্গে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) হাসান মাহমুদ খন্দকার দাবি করেন, পুলিশ বা র্যাব গুমের সঙ্গে জড়িত নয়। বর্তমান পরিস্থিতিতে মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।

No comments:

Post a comment