Wednesday, 29 June 2011

মানবাধিকারের রিপোর্ট : এক মাসে ২১ শিশু ধর্ষণের শিকার নিহত ৩

স্টাফ রিপোর্টার
গত মাসে সারা দেশে ২১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ শিশুকে। আর এদের মধ্যে ৪ শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়। শুধু শিশুই নয় ১১ জন নারীও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএসইএইচআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২ জন ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় একজন। এছাড়া পুলিশ হেফাজতে নিহত ৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছে একজন। একই সময় জেলহাজতে মারা গেছে ৭ জন। বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে ৫ জন, নির্যাতনে আহত হয়েছে ৬ জন এবং অপহরণের শিকার হয়েছে একজন বাংলাদেশী।
গত মাসে সারা দেশে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে ২৯ নারীকে। পারিবারিক কলহের কারণে নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছে ৪১ জন এবং আহত হয়েছে ১০ নারী। এসিডদগ্ধ হয়েছে ১০ নারী। গত মাসে পাচারের সময় উদ্ধার হয়েছে ৬ নারী ও ৩ শিশু। সারা দেশে বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ২১ নারী ও ৮ পুরুষ।

Tuesday, 31 May 2011

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ : বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার ব্যর্থ : মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে



বশীর আহমেদ
বর্তমান সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। র্যাব এবং পুলিশ সদস্যরা অযৌক্তিকভাবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আটক করছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ নানা ধরনের সহিংসতা চলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল লন্ডনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ‘দি স্টেট অব দি ওয়ার্ল্ডস হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।
রিপোর্টে এশিয়া প্যাসিফিক চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সালের প্রথম ১০ মাসে র্যাব এবং পুলিশের হাতে ৬০ জনেরও বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার উদাহরণ দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, গত জুলাই মাসে কুষ্টিয়া জেলার কোনাবাড়িয়া গ্রামের আবদুল আলীমকে পুলিশ সবার সামনে আটক করে। পরের দিন সকালে তার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরে পুলিশ দাবি করে আবদুল আলীমকে গ্রেফতার করতে গেলে সে প্রতিরোধ করে এবং নিহত হয়। আলীমের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুবিচার পাওয়া যায়নি।
বন্দি নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গত বছর ২ জুন আটক করা হয় এই অভিযোগ এনে যে, তিনি বৈধ লাইসেন্স ছাড়া পত্রিকা চালাচ্ছেন। আটক অবস্থায় মাহমুদুর রহমানকে পুলিশ নির্মমভাবে প্রহার করেছে। মাহমুদুর রহমান আদালতে তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন।
রিপোর্টে বলা হয়, আটক অবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে গত বছর অন্তত ৬ জন মারা গেছে। এসব ঘটনা নিয়ে পুলিশি তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত দায়ীদের কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। আটক অবস্থায় গর্ভবতী গার্মেন্ট শ্রমিকরাও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে।
মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, র্যাব এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর বেপরোয়া শক্তি প্রয়োগ করছে। তারা বিএনপি নেতা এবং সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাসের বাড়িতে হরতালের আগের রাতে হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল নারী।
অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার এবং ডিটেনশনের কথা উল্লেখ করে অ্যামনেস্টির রিপোর্টে বলা হয়, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে নির্বিচারে আটক করে। ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল এবং বিভিন্ন সমাবেশ থেকে তাদের আটক করা হয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধে আনা হয় ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাঝে ছাত্রশিবিরের অন্তত ৩০০ সদস্যকে আটক করা হয়। জুন মাসে বিএনপির ২০ নেতাসহ আটক করা হয় ২০০ জনকে।
যুদ্ধপরাধের বিচার প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। সরকার বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মো. কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতার করে তাদের এখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে দেখানো হচ্ছে। তবে তাদের গ্রেফতার করা হয় অন্য অভিযোগে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন ১৯৭৩ গত ২০০৯ সালে সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যমান এই আইনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টে বল হয়, নারীর প্রতি সহিংসতার ৭ হাজার ২৮৫টি অভিযোগ পুলিশের কাছে এসেছে ২০১০ সালের প্রথম ৬ মাসে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল ১ হাজার ৫৮৬টি
।

সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন জে র্যাপ : যুদ্ধাপরাধের বিচারে সহায়তা পেতে আইন সংশোধন করতে হবে















কূটনৈতিক রিপোর্টার

যুদ্ধাপরাধবিষয়ক মার্কিন অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ স্টিফেন জে র্যাপ বলেন, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারে মার্কিন সহায়তা পেতে হলে বিদ্যমান আইন সংশোধন করতে হবে।
তিন দিনের সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার আগে গতকাল রাজধানীর আমেরিকান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন এই বিশেষ দূত বলেন, গত জানুয়ারিতে ঢাকা সফরের সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধা-পরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আমি বেশকিছু সুপারিশ সরকারকে দিয়েছিলাম। এবারের সফরে এসে সেসব বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের এ ব্যাপারে আন্তরিক বলেই মনে হয়েছে। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, বিদ্যমান বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। তিনি বলেন, আমি তাদের জানিয়েছি, এই বিধি সংশোধনের জন্য সংসদের প্রয়োজন নেই। সরকার এবং বিচারকরা রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করে তা করতে পারেন। পরিবর্তিত বিধি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইসিসি আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা যায়।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় মার্কিন সহায়তার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন র্যাপ বলেন, আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী আগে বিদ্যমান বিধির সংশোধন করতে হবে। এই সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যমান বিধি যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়, তাহলেই কেবল আমি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারে সহায়তার জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ জানাতে পারব। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্রাইব্যুনালের বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল না করে মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে—এ ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে র্যাপ বলেন, তাদের জামিনের বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করতে পারে। তবে জামিন দেয়া-না দেয়ার বিষয়টি তাদের এখতিয়ার। বিচারকরা এ ব্যাপারে মাসে মাসে পর্যালোচনা করতে পারেন। সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামি এবং বাদী উভয়পক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার জন্য সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখা যেতে পারে। তবে একটি পর্যায়ে এসে তা অবশ্যই জনসাধারণকে জানাতে হবে। কারণ তা না হলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সাংবাদিকদের অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন দূত বলেন, এই বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসময় লাগতে পারে। তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা, অভিযোগ দায়ের করা, সাক্ষ্য গ্রহণ, আইনজীবীদের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনসহ রায়ের পর সুপ্রিমকোর্টে আপিল—সব মিলিয়ে এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে যদি কোনো পলিটিক্যাল ক্যালেন্ডার শেষ হয়ে যায় তাহলেও যেন বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন জে র্যাপ আরও বলেন, মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তাই এই বিচার প্রক্রিয়ায় যাতে কারও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

Tuesday, 26 April 2011

সেমিনারে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : সর্বোচ্চ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে











কূটনৈতিক রিপোর্টার
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকাজে অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বিচারকরা যে রায় দিচ্ছেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে রায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেসি কাউন্সিল আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এই মন্তব্য করেন। দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল মান্নান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শওকত মাহমুদ, হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেসি কাউন্সিলের সভাপতি ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে বাংলাদেশে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার বক্তৃতায় বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকরা তাদের ইচ্ছেমত সুয়োমোটো রুল দিচ্ছেন তথাকথিত জনস্বার্থের কথা বলে। তাদের রায়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানে অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
আদালত অবমাননার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানকে ৬ মাসের জেল এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল অথচ রায়ে বিচারকরা বলতে পারেননি কীভাবে আদালত অবমাননা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মাহমুদুর রহমানের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভঙ্গি ভালো ছিল না। আবার একই ধরনের অন্য মামলায় একশ’ টাকা জরিমানা অনাদায়ে একদিনের জেল। এই হলো আদালতের অবস্থা। তিনি আরও বলেন, এখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিচারকরা খুব বলছেন। আবার সামরিক শাসন যদি এসে যায়, প্রথমেই এই বিচারকরা বঙ্গভবনে হাজির হবেন শপথ পড়ানোর জন্য। তিনি দুই নেত্রীসহ সবার প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একে অন্যকে কথার মাধ্যমে অপমান করাও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সবার উচিত সহনশীল হওয়া। কখন কাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তা কেউ জানেন না।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই সমাজে এখন কেউ নিরাপদ নয়। সরকার সংবিধান তছনছ করে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। দলীয় লোক এবং পুলিশ দিয়ে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এখন সময় এসেছে প্রতিরোধের। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা না হলে মানবাধিকার রক্ষা হবে না। বাংলাদেশে সরকার যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না।
সভাপতির বক্তৃতায় মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার মানবাধিকারে বিশ্বাস করে না। তারা মানবাধিকারে বিশ্বাস করে না বলেই নিজেরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র যখন এদেশের নিরীহ মানুষদের গুলি করে হত্যা করছে, তখন তার প্রতিবাদ করে না। তিনি বলেন, ১/১১-এর সরকারের সময় যাদের আত্মীয়-পরিজনদের ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চেম্বারে পড়ে পড়ে কাঁদতে দেখেছি, আজ তারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। আজ যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন, তাদের মানবাধিকার রক্ষার জন্য সেই কঠিন দিনগুলোতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আইনের মাধ্যমে আর আমি কলমের মাধ্যমে লড়াই করেছি। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যান, তখন মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিকে একটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ গ্রহণ করব—এই চিন্তা যেন না থাকে। তিনি নিজের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আমি প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। আগামী দিনগুলোতে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনমুক্ত একটি দেশ আমরা পাই, তা হলে আমার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে সেই নির্যাতনের কষ্ট ভুলে যাব। মানবাধিকারের প্রশ্নে আমরা সবাই যদি দল-মত নির্বিশেষে একত্রে দাঁড়াতে পারি, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।
নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে শওকত মাহমুদ তার বক্তৃতায় বলেন, সরকার যখন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে, তখন তার নিরাপত্তা বাহিনীও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরকার যেভাবে সমর্থন জোগাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব। তিনি বলেন, দেশে এখন একটি আতঙ্কজনক পরিস্থিতি চলছে। আদালতের দায়িত্ব তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। সেখানে আদালত যদি তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের শাস্তি দিতে তত্পর হন, সেক্ষেত্রে আমাদের আতঙ্কিত হতে হয়
।

ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে আসা ২ যুবকের লোমহর্ষক কাহিনী : র্যাব বিলুপ্তির দাবি এএইচআরসির












বশীর আহমেদ

নিরপরাধ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে নিষ্ঠুর এবং বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে র্যাব। র্যাবের নির্যাতনের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি)। গত ২০ এপ্রিল প্রকাশিত কমিশনের এক রিপোর্টে র্যাব সদস্যদের নির্যাতনের দুটি কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে। কেস স্টাডিতে রাজীব এবং সজীব নামে পুরান ঢাকার দুই যুবকের ওপর চালানো নির্মম নির্যাতন এবং ক্রসফায়ার থেকে তাদের বেঁচে যাওয়ার লোমহর্ষক কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। এ সম্পর্কে র্যাবের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) কমান্ডার সোয়াহেলের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্টটি আমাদের হাতে আসেনি। আমরা এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।
রিপোর্টটিতে বলা হয়, নাহিদুল হক সজীব, বয়স ২৫। লালবাগ থানার অধীন চাঁনখারপুল এলাকায় তার ঘর। সে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গত ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে কিছু কেনাকাটার জন্য ঘর থেকে বের হয় সজীব। পাশেই তার ব্যবসা অফিস। অফিসের কাছাকাছি এলেই একদল র্যাব সদস্য সজীবকে থামায়। র্যাব সদস্যরা সজীবের কাছে তার নাম, সে কি করে এগুলো জানতে চায়। সজীব তার নাম এবং ব্যবসার কথা বলার পর এক র্যাব সদস্য সজীবকে বলে ‘তুই একজন ছিনতাইকারী।’ একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব সদস্যরা তার চোখ বেঁধে ফেলে গাড়িতে তোলে। চোখ বাঁধার পর তার মুখের ওপর আরও একটি মাস্ক পরিয়ে দেয়া হয়। সজীবকে নিয়ে যাওয়া হয় লালবাগ কেল্লার পাশে অবস্থিত র্যাব-১০-এর ক্যাম্পে। মুখোশ পরিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে ক্যাম্পের দোতলার একটি সেলে সজীবকে রাখা হয়। গভীর রাতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন। সেল থেকে কয়েক গজ দূরে পাশের আরেকটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন র্যাব কর্মকর্তা তার এবং তার বাবার নাম জানতে চান। সজীব উত্তর দেয়ার পর ওই কর্মকর্তা বলেন, আমি তোকেই খুঁজছি। এ কথা বলেই ওই কর্মকর্তা একটি লাঠি দিয়ে সজীবকে পায়ের তলায়, পিঠে ও কাঁধে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সজীব অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে র্যাবেরই একজন ডাক্তার এসে তাকে চিকিত্সা দেন। সজীবের জ্ঞান ফেরার পর র্যাব সদস্যরা তাকে এক প্যাক জুস খেতে দেয়। রাতে র্যাব সদস্যরা সজীবের পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে হ্যাসকে ট্যাগ লাগিয়ে বারবার ইলেকট্রিক শক দেয়। তবে তাকে রাতে আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দেয়া হয়।
৬ এপ্রিল বেলা আড়াইটায় সজীবকে জানানো হয় র্যাবের একজন বড় কর্মকর্তা এসেছেন। সজীবকে ওই কর্মকর্তার সামনে হাজির করা হয়। ওই কর্মকর্তা তার অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে সজীবের গ্রেফতারের ব্যাপারে জানতে চান। জুনিয়র র্যাব কর্মকর্তারা জানান, সন্দেহ করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তথ্য বের করার চেষ্টা হচ্ছে। এ সময় ওই কর্মকর্তা বলেন, ঠিক আছে তথ্য বের করে রিপোর্ট তৈরি কর। প্রয়োজন হলে আরও পেটাবে।
এরপর সজীবকে অন্য একটি রুমে নেয়া হয়, সেখানে একজন ডাক্তার তাকে আবার পরীক্ষা করেন।
৭ এপ্রিল রাত ৩টায় র্যাব সদস্যরা সজীবকে অন্য একটি রুমে নিয়ে যায়। সেখানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে সজীবের ওপর নির্যাতন চালায়। তার আঙ্গুলে সূচ ঢোকানো হয়। ধারালো ধাতব ব্লেড দিয়ে সজীবের নখ কেটে ফেলা হয়। এরপর ওই নখের ওপর এক ধরনের স্প্রে করা হয়, যাতে আঘাতের চিহ্ন বোঝা না যায়। কয়েক দিন পরে সজীবের পায়ের তলায় অস্ত্রের বাঁট দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এখানেই নির্যাতনের শেষ নয়, র্যাব সদস্যরা সজীবের কানের মধ্যে শক্ত কাঠি ঢুকিয়ে দেয়। এ সময় সজীবের কান দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এই নির্যাতনের মধ্যে সজীব জানতে চায় কি তার অপরাধ। তার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে র্যাব সদস্যরা আরও নির্যাতন চালায়।
৮ এপ্রিল রাত আড়াইটায় নতুন ৩ র্যাব সদস্য সজীবকে যেখানে আটক রাখা হয়েছে সেখানে আসে। তারা এসেই সজীবকে উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকে। পরে মেঝেতে ফেলে বুট দিয়ে নির্মমভাবে পাড়াতে থাকে। সজীব অজ্ঞান হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নির্যাতন চলতে থাকে।
৮ এপ্রিল রাতে র্যাব সদস্যরা সজীবের কাছে এসে বলে অজু করে আয়। পরে তাকে সূরা ইয়াসিন এবং সূরা আর-রাহমানের কয়েকটা আয়াত দিয়ে তা পাঠ করতে বলে। সজীব তখন বারবার ওই আয়াতগুলো পড়তে থাকে। সজীবকে আটকের একদিন পর অর্থাত্ ৬ এপ্রিল হোসনি দালান এলাকা থেকে র্যাব সদস্যরা আটক করে কাওসার হোসেন রাজীবকে। রাজীবের বয়স ২৪। প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবসা তার। রাজীব ও সজীব সম্পর্কে কাজিন।
তখন রাত আনুমানিক ৮টা। রাজীব তার বাবা আওলাদ হোসেনের সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিল। পথে সাদা পোশাকে ৮ জনের র্যাবের একটি দল রাজীবকে থামায়। র্যাব সদস্যরা রাজীবকে বলে তাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে। রাজীব এ সময় জানতে চায় তার অপরাধ কী। তখন র্যাব সদস্যরা বলেন একদম চুপ।
রাজীবের বাবা আওলাদ হোসেন এবং ছোট ভাই রনি এ সময় এগিয়ে এসে জানতে চায় কেন রাজীবকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় উত্তেজিত র্যাব সদস্যরা অস্ত্র বের করে বলে কথা বললে গুলি করে মেরে ফেলব। এরপর র্যাব সদস্যরা রাজীবের চোখ এবং মুখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে করে র্যাব-১০-এর লালবাগ কেল্লার পাশে অবস্থিত ক্যাম্পে নিয়ে যায়। চোখ-মুখ বাঁধা অবস্থায় রাজীবকে প্রায় ১ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। এরপর রাজীবকে র্যাবের এক সিনিয়র কর্মকর্তার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি চেয়ারে তাকে চোখ-মুখ বাঁধা অবস্থায় বসানো হয়। এ সময় তার পেছনে বাঁধা হয়। পা দুটি রাখা হয় অন্য একটি চেয়ারের ওপর। হকিস্টিক দিয়ে র্যাব সদস্যরা তার পায়ের তলায় নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করে। এরপর আঙুলে লোহার ক্লিপ লাগিয়ে বারবার ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা চলে এই নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাকে রুমে নিয়ে আসা হয়। তাকে রাতের বেঁচে যাওয়া কিছু খাবার খেতে দেয়া হয়, যা খাওয়ার উপযুক্ত ছিল না। আধ ঘণ্টা পর রাজীবকে আবার অন্য একটি রুমে নেয়া হয়। এ সময় নির্যাতন আর আঘাতের কারণে রাজীব কাঁপছিল। সে হাঁটতে পারছিল না। তখন র্যাব সদস্যরা তাকে হাঁটতে বলে। রাজীব জানায়, তার পায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। নির্যাতনকারী র্যাব সদস্যরা এখন যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দেব এই কথা বলে আবার পেটাতে শুরু করে। রাজীবের আঙুল এবং নখের মধ্যে সূই ঢুকিয়ে দেয়। রুমের মেঝেতে পড়ে থাকে রাজীব। নিষ্ঠুর র্যাব সদস্যরা এ সময় রাজীবকে আবার ওঠে দাঁড়াতে বলে। রাজীব জানায়, তার দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। এরপর রাজীবের শরীরের কয়েকটি ধাতব পাত জড়িয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। ইলেকট্রিক শকে রাজীব দূরে ছিটকে পড়ে। র্যাব সদস্যরা তখন বলে, তুই নাকি দাঁড়াতে পারবি না, এখন দেখলি তো তুই লাফাতেও পারিস।
এভাবে নির্যাতন চালিয়ে র্যাব-১০-এর সদস্যরা রাজীবকে তাদের নির্দেশমত স্বীকারোক্তি দিতে বলে। আর স্বীকারোক্তি না দিলে তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। ৭ এপ্রিল রাজীবকে নিয়ে র্যাব সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং ক্রসফায়ারে মারার ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। র্যাব সদস্যরা বারবার বলে তুই একজন ছিনতাইকারী।
৮ এপ্রিল মধ্যরাতে র্যাব সদস্যরা রাজীব এবং সজীবকে চোখ-মুখ বেঁধে একটি গাড়িতে করে আজিমপুর এলাকার দিকে যায়। গাড়ির মধ্যে যখন তাদের চোখ-মুখ খুলে দেয়া হয়, তখন তারা একে অন্যকে চিনতে পারে এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। এ সময় তাদের ওপর আবার নির্যাতন চালানো হয়। সজীব এবং রাজীবকে নিয়ে র্যাব সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। এক পর্যায়ে তাদের ক্রসফায়ারে মারার জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সোয়ারীঘাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় র্যাবের সঙ্গে পুলিশ এবং অন্যান্য এজেন্সির সদস্যরাও ছিল। র্যাব কর্মকর্তারা এ সময় রাজীব এবং সজীবকে দৌড়াতে বলে। কিন্তু তারা দৌড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা জানে দৌড়ালে তাদের গুলি করা হবে। রাজীব এবং সজীব এক র্যাব কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে আকুতি জানায়, আমাদের মারবেন না। আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে চলুন। এ সময় আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টার থেকে দু’জন গার্ডকে নিয়ে আসা হয়েছিল, যারা র্যাবের নির্দেশে রাজীব এবং সজীবকে ছিনতাইকারী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়ে একটি কাগজে সই করে। এরই মধ্যে সকাল হয়ে আসে। র্যাব সদস্যরা ওই রাতে রাজীব এবং সজীবকে না মেরে ফেরত নিয়ে যায়। র্যাবের এক কর্মকর্তা তাদের বলেন, তোদের মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত ছিল। হয়তো জীবনে কোনো ভালো কাজ করেছিলি তাই বেঁচে গেলি। নিয়মিত নামাজ পড়বি।
৯ এপ্রিল সকালবেলা র্যাব-১০-এর ক্যাম্পে সজীব এবং রাজীবকে নিয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রাজীবকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। সজীবকে হাজির করা হয় র্যাবের এক সিনিয়র কর্মকর্তার রুমে। ওই কর্মকর্তা উত্তেজিত কণ্ঠে গালাগাল দিয়ে বলেন, মন্ত্রী-এমপি দিয়ে ফোন করিয়ে ক্ষমতা দেখাস। যা বেঁচে গেলি বলে তিনি সজীবকে পেটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে বলেন, আমরা আমাদের ক্ষমতা দেখালাম। এরপর ছিনতাই মামলা দিয়ে দু’জনকে চালান করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন র্যাব কর্মকর্তা। বিকেলের দিকে হাসপাতাল থেকে রাজীবকে ফিরিয়ে আনা হয়। সজীব ও রাজীব দুজনের বুকে নাম লিখে সামনের টেবিলে দুটি ছুরি রেখে ছবি তোলা হয়। এরপর লালবাগ থানায় নিয়ে ছিনতাইকারি বলে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রুজু করতে বললে ডিউটি অফিসার প্রথমে অপারগতা জানান। তার যুক্তি, ছিনতাই করেনি- করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এ কারণে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয় না। ছিনতাই করলে ছিনতাইকৃত মালামালের দরকার। তখন র্যাব কর্মকর্তা সজীব ও রাজীবকে আটকের সময় তাদের কাছে থাকা মোবাইল এবং টাকা ছিনতাইকৃত বলে উল্লেখ করে মামলা দায়ের করতে বলেন। এক পর্যায়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিউটি অফিসার কথা বলেন এবং মামলা রুজু করেন। ১০ এপ্রিল সজীব ও রাজীবকে কোর্টে চালান দেয় পুলিশ। কোর্টে তাদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর হয়। র্যাব সদস্যরা পুলিশের হাতে তাদের তুলে দেয়ার আগে শাসিয়ে দেয় নির্যাতনের কাহিনী কোথাও প্রকাশ করলে তাদের মেরে ফেলা হবে। কিন্তু জীবনের মায়া উপেক্ষা করেই মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন সজীব ও রাজীব। তারা জানান, মুক্ত হওয়ার পরও তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে টেলিফোনে।
এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের পক্ষ থেকে র্যাবের এই বর্বর অপরাধের তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি অবিলম্বে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানানো হয়।

মানবাধিকার লংঘনকারী রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে বাংলাদেশ







বশীর আহমেদ
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্ট প্রকাশের পর এখন বাংলাদেশের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ভয়াবহ চিত্র নিয়ে সর্বত্রই আলোচনা হচ্ছে। মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশে বিচারবহির্ভূত হত্যা, রিমান্ডের নামে নির্যাতন, বিচার বিভাগ দলীয়করণ ও ন্যায়বিচার না পাওয়া, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, রাজনৈতিক সহিংসতা, সীমান্তে হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিস্তারিত বিবরণ উদাহরণসহ তুলে ধরা হয়েছে। তবে মার্কিন এই রিপোর্ট সম্পর্কে বাংলাদেশের মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান বলেছেন, মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টটি হতাশাজনক। বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী ও কলামিস্ট বদরুদ্দীন উমর বলেছেন, বাংলাদেশ এখন মানবাধিকার হত্যাকারী রাষ্ট্র। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, যাদের দায়িত্ব মানবাধিকার রক্ষা করা তারা এখন ইচ্ছেমত মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে।। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. মনিরুজ্জামান মিঞা তার প্রতিক্রিয়ায় বলেছেন, বাংলাদেশে এখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
উল্লেখ্য, মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয় :
বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েই চলেছে। আটক অবস্থায় মৃত্যু, নির্যাতন, অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার এবং ডিটেনশনের জন্য এই নিরাপত্তা বাহিনী দায়ী। বিচারবহির্ভূত এসব হত্যা এবং বিভিন্ন অপরাধের সঙ্গে যুক্ত র্যাবের ব্যাপারে সব ধরনের তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। এটা গভীর উদ্বেগ তৈরি করেছে। নিরাপত্তা বাহিনীর কিছু সদস্য এ ধরনের অপরাধ করছে এই নিশ্চয়তা নিয়ে যে, তাদের কোনো শাস্তি হবে না। এতে বিচারের আগেই কারাগারে মৃত্যুঝুঁকির পরিবেশ তৈরি হয়েছে। কর্তৃপক্ষ নাগরিক অধিকারকে উপেক্ষা করেছে। বিচার বিভাগকে অব্যাহতভাবে রাজনীতিকীকরণ করায় বিচারব্যবস্থায় বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হয়েছে। এর ফলে বিশেষ করে বিরোধী দলের জন্য এখন ন্যায়বিচার পাওয়ার সুযোগ
সীমিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার গণমাধ্যম এবং জনগণের বাকস্বাধীনতাকে সীমিত করে ফেলেছে। গণমাধ্যমগুলো সেলফ সেন্সরশিপ করতে বাধ্য হচ্ছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা প্রতিনিয়ত হয়রানি করছে সাংবাদিকদের। সরকার সভা-সমাবেশের অধিকারকে সীমিত করেছে এবং অব্যাহত রয়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা। এটা এখন একটি বড় সমস্যা।
সরকারি পর্যায়ে দুর্নীতি অব্যাহত গতিতে চলছে এবং দুর্নীতির সঙ্গে যারা যুক্ত, তারা শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে। নারীর প্রতি বৈষম্য এবং নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতা একটি ভয়াবহ সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে বাংলাদেশে। নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক ধর্ষণের শিকার হচ্ছে নারীরা। মানব পাচার এখনও বড় সমস্যা।
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্ট সম্পর্কে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান আমার দেশকে বলেন, যেনতেনভাবে এ রিপোর্ট তৈরি করা হয়েছে। এখানে অনেক পুরনো তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিভিন্ন ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। উদাহরণসহ এ ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, এখানে নতুন কিছু নেই। বিষয়গুলো আমাদের জানা।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব ঘটনা বন্ধে কমিশন এখন কী পদক্ষেপ নেবে—এ প্রশ্নের জবাবে কমিশনের চেয়ারম্যান বলেন, মানবাধিকার লঙ্ঘন রোধ করতে আমরা যে কৌশল প্রণয়ন করছি সেখানে বিষয়গুলো বিবেচনায় নেয়া হবে।
বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী, কলামিস্ট ও রাজনীতিক বদরুদ্দীন উমর মার্কিন রিপোর্ট ও বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার দেশকে বলেন, মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে যেসব তথ্য এসেছে, তার সত্যতা আছে। তবে তাদের এই রিপোর্ট নিয়ে আমাদের হৈচৈ করার কিছু নেই। আমরাই ভালো জানি আমাদের মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে। আমরাই এর ভুক্তভোগী। মার্কিন রিপোর্টে যেসব বিষয় এসেছে, সেসব ব্যাপারে আমরা বলে বলে হয়রান হয়ে গেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এখন মানবাধিকার রিপোর্ট দিচ্ছে; কিন্তু তাদের সমর্থন নিয়েই তো সরকার মানবাধিকার লঙ্ঘন করে। তিনি বলেন, বিচারবহির্ভূত হত্যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের সর্বোচ্চ পর্যায়। এর বাইরে আরও ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। কথায় কথায় গ্রেফতার করে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করা ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘন। আপনার সম্পাদককেও তো বারবার রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করেছে। বিচারকরাও এখন রিমান্ডের অনুমতি দিয়ে দেন। তিনি আরও বলেন, এখন সভা-সমাবেশ করতে দেয়া হয় না। হরতাল করতে বাধা দেয়া হয়। হরতাল ভালো না খারাপ তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; কিন্তু হরতাল একটি গণতান্ত্রিক অধিকার।
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মানবাধিকার পরিস্থিতি সম্পর্কে আমার দেশকে বলেন, মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে মানবাধিকার লঙ্ঘনের যেসব ঘটনা তুলে ধরা হয়েছে, তার সবই ঠিক। এসব মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তো আমরা এখন পত্রিকার পাতায় প্রতিনিয়ত দেখতে পাই। বিচারবহির্ভূত হত্যা এখন ভয়ঙ্কর রূপ নিয়েছে। এখানে যার যা খুশি তা-ই করছে। সরকারের কোনো নিয়ন্ত্রণ আছে বলে আমার মনে হয় না। বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, যাদের হাতে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার রক্ষার দায়িত্ব তাদের হাতেই মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। কোনো সভ্য সমাজে এটা চলতে পারে না। মানবাধিকার রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে তাদের বিরুদ্ধে সরকার যদি পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে। মানবাধিকার রক্ষায় গণমাধ্যমের ভূমিকা ইতিবাচক। বিরোধী দলের উচিত সংসদে মানবাধিকার ইস্যুতে সোচ্চার হওয়া।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবী প্রফেসর ড. মনিরুজ্জামান মিঞা তার প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। মার্কিন মানবাধিকার রিপোর্টে তারই প্রতিফলন হয়েছে। আমি মনে করি, মার্কিন এই রিপোর্টটি তথ্যভিত্তিক। বিচারবহির্ভূত হত্যা, ন্যায়বিচার না পাওয়া, দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতাসহ যেসব বিষয় রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে তা সঠিক। তিনি বলেন, এখন সরকার যদি বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধ, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবাধিকার রক্ষায় সচেষ্ট হয় তাহলেই কেবল পরিস্থিতির উন্নতি ঘটতে পারে
।

র্যাব-পুলিশের নতুন কৌশল আটকের পর হাঁটুতে গুলি

নাছির উদ্দন শোয়েব

বুকে গুলিবিদ্ধ হলে নির্ঘাত মৃত্যু, আর হাঁটুতে কিংবা পায়ে গুলি লাগলে বেঁচে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। প্রাণে বেঁচে গেলেও ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কাটাতে হয় সারাটি জীবন। অনেকে পঙ্গুও হয়ে যায় চিরতরে। র্যাব ও পুলিশের ক্রসফায়ার নিয়ে আদালত ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো সোচ্চার হওয়ায় ভিন্ন কৌশল নিয়েছে আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা। অভিযানের নামে সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটকের পর হাঁটুর নিচে অথবা পায়ে গুলি চালিয়ে তাকে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। এই নতুন কৌশলে অপরাধ কমবে বলে র্যাব ও পুলিশের ধারণা। গত দু’বছরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে আহত ও পঙ্গু হয়েছে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। এসব গুলিবিদ্ধের বেশিরভাগই বয়সে কিশোর-তরুণ। তবে আটক বা গুলিবিদ্ধ ভিকটিম পরিবারের দাবি, অভিযানের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিকে অপরাধী সন্দেহে তাদের চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে গুলি করা হয়েছে। বিভিন্ন সময় আহতদের আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সদস্যরা এ ধরনের অভিযোগ করেছেন, যার প্রমাণ রয়েছে।
এ ব্যাপারে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েল জানান, র্যাব সদস্যদের প্রতি আটক করে কাউকে গুলি করার যে অভিযোগ তা একেবারেই ভিত্তিহীন। অপরাধী গ্রেফতার করতে গিয়ে র্যাব সদস্যদের সঙ্গে দুষ্কৃতকারীদের বিভিন্ন সময়ে গোলাগুলি হয়। এ ধরনের অভিযানের সময় কখনও গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনাও ঘটে। র্যাব সদস্যরাও সন্ত্রাসীদের গুলিতে আহত হয়। অভিযানের সময় সন্ত্রাসীরা গুলি চালালে জীবন রক্ষার্থে র্যাব সদস্যদেরও পাল্টা গুলি চালানোর অধিকার রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সন্ত্রাসীদের দমনে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। বেপরোয়া অপরাধীদের গ্রেফতারে অভিযানে নেমে গোলাগুলি এবং গুলিবিদ্ধ হওয়ার অহরহ ঘটনা ঘটছে। তবে অভিযোগ রয়েছে, সন্দেহ হলেই রাস্তা থেকে কোনো ব্যক্তিকে আটক করে পায়ে গুলি করে আহত করা হয়। সম্প্রতি এ ধরনের অনেক অভিযোগ আসছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের গুলি করে ছিনতাইকারী ও চাঁদাবাজ বলেও চালিয়ে দেয়া হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে। তবে গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিদের স্বজনরা আটক হওয়া ব্যক্তিকে নিরপরাধ বলে দাবি করেন। অনেক সময় পুলিশের হেফাজতে থাকাকালে ভিকটিম নিজেকে নিরপরাধ প্রমাণ করারও সুযোগ পায় না। তবে কয়েকটি ঘটনায় জানা গেছে, পুলিশ যাদের আটক করে ছিনতাইকারী বলে গুলি করেছে এর মধ্যে নিরপরাধ লোকের সংখ্যাই বেশি।
পুলিশ ও হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, গত দু’বছরে র্যাব-পুলিশের গুলিতে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি পঙ্গু হয়েছে। রাতে টহল দেয়ার সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে আটক করার পর ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত রয়েছে কিনা, এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। আবার কখনও কিছুই জানতে না চেয়ে, এমনকি সঠিক তথ্য না নিয়ে সোর্সনির্ভর হয়ে গভীর রাতে চোখ বেঁধে নির্জন স্থানে নিয়ে পায়ে গুলি চালিয়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করা হয়। এরপর হাসপাতালে নিয়ে চিকিত্সাও দেয়া হয় তাদের পাহারায়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাহারায় থাকা গুলিবিদ্ধ ব্যক্তিকে বিভিন্ন কৌশলে অপরাধী বলে প্রচার করা হয়। কখনও শীর্ষ সন্ত্রাসীর সহযোগী, কখনো দাগি অপরাধীর সেকেন্ড ইন কমান্ড, কিলার, চাঁদাবাজ ও ছিনতাইকারী বলে প্রমাণ করার চেষ্টায় থানায় একাধিক কারণ দেখিয়ে মামলা করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রতিটি ঘটনায়ই র্যাব ও পুলিশের পক্ষ থেকে সেই একই ধরনের গল্প প্রচার করা হয়। পুলিশের একটি সূত্র জানায়, কোনো পথচারী ছিনতাইকারীর কবলে পড়লে পুলিশের টহল দল তাদের ধাওয়া করলে পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা। এসময় পুলিশও পাল্টা গুলি চালালে ছিনতাইকারী আহত বা নিহত হয়। তবে অনুসন্ধান করে আরও জানা গেছে, অধিকাংশ ঘটনায়ই আহত ব্যক্তির পায়ে গুলিবিদ্ধ হয়। শরীরের অন্য কোথাও গুলি না লাগায় মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায় যে গোলাগুলির ঘটনাটি ছিল রহস্যজনক। একতরফা গুলিতেই আহত হয়েছে ওই ব্যক্তি। অপরদিকে গুলিবিনিময়ের সময় ছিনতাইকারী সন্দেহের ব্যক্তি আটক হলেও তার কাছে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র পাওয়া যায় না। দু-একজনের কাছ থেকে ছোরা উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
একটি নির্মম ঘটনা : গত ২৩ মার্চ বিকালে ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের দিনমজুর তোফাজ্জল হোসেনের ছোট ছেলে লিমন মাঠে গরু আনতে গিয়ে র্যাবের হাতে আটক হয়। কাঁঠালিয়া পিজিএস কারিগরি কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী সে। পথে স্থানীয় শহীদ জমাদ্দারের বাড়ির সামনে র্যাব-৮-এর একটি দল তাকে সামনে পেয়ে শার্টের কলার ধরে নাম জিজ্ঞেস করে। লিমন নিজেকে ছাত্র বলে পরিচয় দিলেও র্যাবের এক সদস্য কথাবার্তা ছাড়াই তার বাঁ পায়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করে। গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও পরে পঙ্গু হাসপাতালে আনলে চিকিত্সকরা তার পা কেটে ফেলেন। এই নির্মমতার খবর পত্রিকায় প্রকাশিত হলে লিমনের খবর জানতে গত বুধবার সকালে পঙ্গু হাসপাতালে ছুটে যান গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংস্থার কর্মীরা। কিন্তু হাসপাতালে ঢুকেই তারা হতবাক—যে ওয়ার্ডে লিমন চিকিত্সাধীন সে ওয়ার্ডের দরজা তালাবদ্ধ। দুপুর পর্যন্ত কেউ সেখানে ঢুকতে পারেননি। পরে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমানও লিমনকে দেখতে হাসপাতালে গেলে লিমনের আত্মীয়-স্বজনরা বিভিন্ন অভিযোগ করেন। বর্তমানে পুলিশ পাহারায় ওই নিরপরাধ কিশোর ছেলেটি হাসপাতালের বেডে যন্ত্রণায় ছটফট করছে। মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানের কাছে লিমন তার ওপর র্যাবের নির্মমতার পুরো বিবরণ দিয়েছে। সে চেয়ারম্যানকে বলেছে, স্যার, আমি জীবনে পিস্তল দেখিনি, আর এখন আমি অস্ত্র মামলার আসামি। আমার কপালে কালির দাগ লেগে গেল। বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়ে ওই তরুণ। নিজেকে সামলে রাখতে পারছিলেন না চেয়ারম্যান নিজেও।
এদিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী অ্যাডভোকেট শামসুল হক টুকু সচিবালয়ে নিজ দফতরে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, লিমনের ঘটনায় প্রয়োজন হলে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে তদন্ত কমিটি করা হবে। তবে র্যাবের নিজস্ব বিভাগীয় তদন্ত দল রয়েছে, তারাও তদন্ত করতে পারে। এদিকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন লিমন হোসেনের ঘটনা দ্রুত তদন্তের জন্য অনুরোধ জানিয়ে বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে।
র্যাবের বক্তব্য : লিমনের ব্যাপারে জানতে চাইলে র্যাব সদর দফতরের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইং থেকে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বলা হয়, পত্রিকায় ঘটনাটি যেভাবে এসেছে প্রকৃত ঘটনা তা নয়। এতে বলা হয়, ২৩ মার্চ দিনের বেলায় র্যাবের দুটি বিশেষ অভিযান দল ১৮টি মামলার আসামি এবং ৯০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ-প্রাপ্ত পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী মোরশেদ জমাদ্দারকে গ্রেফতারের উদ্দেশ্যে রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামে তার গোপন আস্তানায় অভিযান চালায়। ওই আস্তানাটি সন্ত্রাসী মোরশেদের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে ধানক্ষেতের মধ্যে একটি কলাবাগান। খালের পাড় ধরে হেঁটে বাঁশের বেড়া টপকিয়ে মোরশেদের আস্তানায় ঢুকতে হয়। ওই দিন র্যাবের অভিযান দলের অগ্রগামী সাদা পোশাকধারী ২ র্যাব সদস্য মোরশেদের আস্তানায় প্রবেশ করলে লিমনসহ কিছু সন্ত্রাসী এগিয়ে এসে র্যাব সদস্যদের গতিরোধ করে আস্তানায় নেয়ার চেষ্টা করে। এ সময় র্যাব সদস্যদের সন্দেহ হলে নিজেদের পরিচয় প্রদান করে। এরই মধ্যে কলাবাগানের পেছনে অবস্থানকারী র্যাব পোশাক পরিহিত অভিযান দলের অপর সদস্যরা এগিয়ে আসে। এরই মাঝে ওই অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা গ্রেফতার এড়ানোর লক্ষ্যে র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে গুলি চালায়। তত্ক্ষণাত্ র্যাব সদস্যরাও কিছু দূরে অবস্থান নিয়ে পাল্টা গুলি চালায় এবং আহত অবস্থায় লিমনকে আটক এবং ঘটনাস্থল থেকে গুলিভর্তি আগ্নেয়াস্ত্র এবং রামদাসহ দেশীয় ধারাল অস্ত্র উদ্ধার করে। তবে লিমন কার গুলিতে আহত হয় তা তাত্ক্ষণিক জানা যায়নি বলে র্যাবের দাবি। ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, স্থানীয় থানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, লিমন জামিনপ্রাপ্ত একজন চার্জশিটভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে রাজাপুর থানার মামলা নম্বর ০৫, তারিখ ৩/১২/২০০৯, ধারা : ১৪৩/৩৪১/৩২৩/৩২৪/৩৭৯/৫০৬ রুজু রয়েছে এবং ওই মামলায় গত ১০ জানুয়ারি সে জামিন পায়। এ ব্যাপারে আমার দেশ-এর রাজাপুর প্রতিনিধি রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করলে ওসি জানান, লিমনের নামে এক বছর আগের একটি মারামারি মামলা রয়েছে এবং এ মামলায় শুরু থেকেই সে জামিনে আছে। এমন কোনো গুরুতর অভিযোগ বা মামলা তার নামে নেই।
উল্লেখযোগ্য আরও কয়েকটি ঘটনা : চলতি বছর ২০ জানুয়ারি রাজধানীর মেরুল বাড্ডায় র্যাব-১-এর গুলিতে মধ্যবাড্ডার জাহাঙ্গীর আলমের ছেলে শামসুর রহমান শিমু (২২) এবং মেরুল বাড্ডার হাতিরঝিল এলাকার আবুল বাশারের ছেলে ঈসরাফিল আলম (২০) আহত হয়। র্যাব তখন বলেছিল, গুলিবিদ্ধ দুই যুবক পেশাদার ছিনতাইকারী। ২৪ মার্চ কমলাপুর স্টেডিয়ামের কাছে র্যাব-৩-এর গুলিতে আহত হয় দুই কিশোর সানি (১৮) ও আরিফ (১৭)। র্যাবের দাবি, গুলিবিদ্ধ দু’জনই ছিনতাইকারী। ৩০ মার্চ পুরানাপল্টনে র্যাবের গুলিতে রুবেল (১৮) ও সোহেল (২০) নামে দুই কিশোর আহত হয়েছে।
গত বছর ৯ ফেব্রুয়ারি সবুজবাগের মাদারটেক এলাকায় র্যাবের গুলিতে রুবেল হোসেন (২০) নামে এক যুবক আহত হয়। ২৬ নভেম্বর মতিঝিল আইডিয়াল ল্যাবরেটরি হাইস্কুলের সামনে র্যাবের গুলিতে আহত হয় তিন যুবক। এরা হচ্ছে ইসমাইল হোসেন বিল্লাল, ফারুক হোসেন এবং মামুন। র্যাব কর্মকর্তারা আহত তিন যুবককে ছিনতাইকারী দাবি করলেও তাদের পরিবার র্যাবের অভিযোগ অস্বীকার করে। ২৭ সেপ্টেম্বর ছিনতাইকারী সন্দেহে র্যাব ও পুলিশের গুলিতে তিনজন আহত হয়। আগারগাঁও এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে গুলি করে সুমন ওরফে পিচ্চি সুমন (২২) এবং জামাল হোসেন (২৪) নামে দুই কিশোরকে আটক করে র্যাব। র্যাবের দাবি তাদের কাছ থেকে ২টি গুলিসহ আমেরিকায় তৈরি একটি পিস্তল, একটি দেশীয় পাইপগান ও একটি ধারাল ছুরি উদ্ধার করা হয়। অন্যদিকে গেণ্ডারিয়া এলাকায় ছিনতাইকারী সন্দেহে ফয়সাল (২৩) নামে এক যুবককে গুলি করে আটক করে পুলিশ।
এর আগে পুরনো ঢাকার কোতোয়ালি এলাকায় পুলিশের গুলিতে আহত হয় কালু মিয়া নামে এক যুবক। পুলিশ জানায়, কালু মিয়া এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী। স্থানীয়রা বলেছিলেন, কালুকে আটকের পর চোখ বেঁধে তাতীবাজার প্রসন্ন পোদ্দার লেনের একটি নির্মাণাধীন বাড়িতে নিয়ে বাঁ পায়ে দু’রাউন্ড গুলি করে পুলিশ। কালুর আত্মীয়-স্বজনরা পুলিশের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ করেন। একই বছর ১৯ জুলাই মিরপুরে পুলিশের গুলিতে শ্রমিক নেতা রফিকুল ইসলাম রুমীর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় তার সহযোগী জহিরুল আলমও গুলিবিদ্ধ হয়। পুলিশ জানায়, রুমি ডাকাত ছিল। অপরদিকে আত্মীয়-স্বজনের দাবি রুমি ডাকাত কিংবা অপরাধী ছিল না। সেদিন পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিও হয়নি। রুমিকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করেছে। স্বজনরা আরও জানান, রুমি বিমানবাহিনীর সাবেক সার্জেন্ট ছিল। সায়েদবাদ-ক্যান্টনমেন্ট সড়কের শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ও জিয়া বিমানবন্দর থানা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্লাবের সভাপতি ছিল সে। এর আগে বিয়ের আসর থেকে ফেরার পথে নৃত্য শিল্পীসহ চারজনকে ছিনতাইকারী সন্দেহে গ্রেফতার করে গুলি করে মোহাম্মদপুর থানা পুলিশ। এ ছাড়াও ছিনতাইকারী সন্দেহে পুলিশ, র্যাব ও ডিবি সদস্যদের গুলিতে আরও বহু মানুষ আহত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পল্লবীতে রুবেল, আমিনুল ইসলাম, কাকলীতে মকবুল হোসেন, হাফিজুর রহমান, বনানীতে আনোয়ার হোসেন, আদাবরে মোবারক হোসেন, হীরা, তেজগাঁওয়ে জাহাঙ্গীর হোসেন, উজ্জ্বল, সূত্রাপুরে সেলিম, মোহাম্মদপুরে সবুজ মিয়া ও সেলিম।
মানবাধিকার সংস্থার উদ্বেগ ও প্রতিবাদ : র্যাবের গুলিতে পা হারিয়ে পঙ্গু হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ঝালকাঠির কলেজছাত্র লিমনের ঘটনায় আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) গভীর উদ্বেগ এবং প্রতিবাদ জানিয়েছে। এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, লিমনকে অস্ত্র ঠেকিয়ে গুলি করলেও তার বিরুদ্ধে কী অভিযোগ তা র্যাব পরিষ্কার করতে পারেনি। এমনকি তাকে গুলি করার পর র্যাব তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করলেও তদন্তকারী কর্মকর্তা এখন পর্যন্ত কোনো অভিযোগের প্রমাণ পায়নি। লিমনের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে র্যাবের দায়িত্ব ছিল তাকে বিচার প্রক্রিয়ায় সোপর্দ করা। কিন্তু তা না করে প্রকাশ্যে গুলি করে র্যাব বিচার ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে, যা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার শামিল। সেইসঙ্গে র্যাব আইনের রক্ষক থেকে ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের (বামাক) চেয়ারম্যান বিচারপতি একেএম সাদেক এবং মহাসচিব দিলদার এক বিজ্ঞপ্তিতে র্যাব কর্তৃক এইচএসসি পরীক্ষার্থী লিমনকে গুলি করা এবং পরে তার পা কেটে ফেলার ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। এই নিষ্ঠুরতম ঘটনাটির সুষ্ঠু তদন্ত এবং দায়ী র্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে জরুরি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।