Friday, 5 August 2011

যুদ্ধাপরাধবিষয়ক আন্তর্জাতিক সেমিনার : ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেয়ার দাবি আইনজীবীদের



স্টাফ রিপোর্টার
যুদ্ধাপরাধ বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইমস ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন আইনজীবীরা। একইসঙ্গে তারা অবিলম্বে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমকে তার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর দাবি জানিয়ে বলেন, তিনি ওই পদে থাকার যোগ্যতা হারিয়েছেন। ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত গণতদন্ত কমিশন এবং গণআদালতের সঙ্গে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের সম্পৃক্ত থাকার বিষয়ে তথ্য-প্রমাণ উপস্থাপন করে গতকাল আন্তর্জাতিক একটি সেমিনারে আইনজীবীরা এ দাবি জানান। সেমিনারে অংশ নেয়া দেশের খ্যাতিমান আইনজীবীরা বলেন, এ ট্রাইব্যুনাল তার নিরপেক্ষতা হারিয়েছে এবং এ ধরনের বিচারের
যোগ্যতা ও দক্ষতা তাদের নেই। এ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ন্যায়বিচার পাওয়ার কোনো আশা নেই। যুদ্ধাপরাধ বিচার নয়, বরং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিরোধী ইসলামী দল ও নেতৃবৃন্দকে ধ্বংস করাই তাদের লক্ষ্য।
নাগরিক ফোরামের উদ্যোগে রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এ সেমিনারে বক্তারা বলেন, ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদে বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। কারণ যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বর্তমানে যাদের আটক করা হয়েছে তিনি আগে থেকেই তাদের একই অভিযোগে অভিযুক্ত করে তাদের বিচার দাবি করেছেন। একজন বিচারপতি হিসেবে তার এ পদ গ্রহণ করাও ন্যায়সঙ্গত হয়নি।
‘বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশে ফৌজদারি বিচার পদ্ধতি : আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত কি রাবার স্ট্যাম্প’ র্শীষক সেমিনারে আইনজীবীরা বলেন, বিচার নয় বরং বিএনপির কয়েকজন নেতাকে হেয় করা এবং জামায়াতে ইসলামীকে ধ্বংস করার জন্যই যুদ্ধাপরাধের বিচার চলছে। এটি এখন আর এদেশের কারও কোনো বক্তব্য নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এখন এ কথা বলতে শুরু করেছে। লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন দি ইকোনমিস্টের চলতি সংখ্যার একটি প্রতিবেদনে একথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেনের সভাপতিত্বে সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ। বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন সাবেক স্পিকার ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার এমপি, ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক, বিশিষ্ট সাংবাদিক সাদেক খান, সুপ্রিমকোর্টের সিনিয়র আইনজীবী জয়নুল আবেদীন, সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সেক্রেটারি ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল, ঢাকা বার অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট সানাউল্লাহ মিয়া, সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের কোষাধ্যক্ষ ফাহিমা নাসরিন মুন্নি, সুপ্রিমকোর্টের আইনীজীবী ব্যারিস্টার বেলায়েত হোসেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হোমাম কাদের চৌধুরী প্রমুখ।
অনুষ্ঠানে যোগ দেয়ার জন্য যুদ্ধাপরাধবিষয়ক ব্রিটিশ আইনজীবী টবি ক্যাডম্যান সেমিনারে যোগ দেয়ার জন্য বিমানবন্দরে এসে পৌঁছলে তাকে সেখান থেকে ফেরত পাঠানো হয় সরকারের নির্দেশে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নাগরিক ফোরামের সভাপতি আবদুল্লাহেল মাসুদ।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ যুদ্ধাপরাধ আদালত বিষয়ে চার দফা দাবি উপস্থাপন করে বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান পদে থাকার কোনো নৈতিক অধিকার নেই। তিনি ১৯৯২ সালের গণআদালতের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছিলেন। এছাড়া ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত গণতদন্ত কমিশনের সেক্রেটারিয়েট সদস্য ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, কোনো বিচারের সঙ্গে আগেই যাদের দূরতম কোনো সম্পর্ক থাকে তারা কোনোদিন সেই একই বিচারের ক্ষেত্রে বিচারকের আসনে বসতে পারেন না। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, বিচারপতি নিজামুল হক কি তার পূর্ব সম্পৃক্ততার বিষয় অস্বীকার করতে পারবেন?
বন্দি ব্যক্তিদের জামিন দিতে হবে দাবি করে মওদুদ আহমদ বলেন, অনেকদিন তাদের আটকে রেখেছেন আপনারা। এক বছর পার হয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো চার্জশিট দিতে পারেননি। এ থেকে বোঝা যায়, রাজনৈতিক কারণে ট্রাইব্যুনাল তাদের বিষয়ে বিলম্ব করছে এবং আটক রেখেছে। এজাতীয় বিচারে কোনোদিন স্বচ্ছতা আশা করা যায় না। ট্রাইব্যুনাল যোগ্যতা হারিয়েছে উল্লেখ করে মওদুদ আহমদ বলেন, এ ট্রাইব্যুনাল ভেঙে দিতে হবে এবং নতুন করে গঠন করতে হবে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের লক্ষ্যে গঠিত ট্রাইব্যুনালের এ ধরনের বিচারের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তারা অদক্ষ। কোনোদিন এ জাতীয় বিচার তারা করেননি। এ ট্রাইব্যুনাল যুদ্ধাপরাধ বিচার করার ক্ষমতা রাখে না। ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি, আইনজীবী এবং তদন্তকারী অনেকেই ঘাতক-দালাল, গণআদালত এবং গণতদন্ত কমিশনের সঙ্গে জড়িত। তারা নিরপেক্ষ নন। ১৯৭৩ সালের যুদ্ধাপরাধ আইনকে সুরক্ষার জন্য যে সংবিধান সংশোধন করা হয় তা ছিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাই এ বিচার প্রক্রিয়াও সাংবিধানিক নয়।
এ চার দফা দাবি জানিয়ে মওদুদ আহমদ বলেন, যদি আপনারা এগুলো না মানেন তাহলে প্রমাণ হবে আপনারা রাজনৈতিকভাবে বিরোধী দলকে ধ্বংস করার জন্য এ বিচার করছেন। বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর জন্য তার পরিবার বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু আপনারা সে অনুমতি দেননি। একইভাবে জামায়াত নেতাদেরও এ সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, আপনাদের নিরপেক্ষ বিচারের সাহস নেই। টবি ক্যাডম্যান নামে একজন ব্রিটিশ আইনজীবী আজকের এ সমাবেশে যোগ দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাকে বিমানবন্দরে আটকে দেয়া হয়েছে। এ থেকেও বোঝা যায়, আপনারা নিরপেক্ষ এবং স্বচ্ছ নন। গোটা জাতি এবং বিশ্ব বুঝে গেছে, এ বিচার হচ্ছে রাজনৈতিক কারণে বিরোধী দল দমনের জন্য। ইকোনমিস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনেও সে কথা বলা আছে।
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বলেন, অভিযোগকারী কখনও বিচারের আসনে বসতে পারেন না। যিনি একজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন তিনি কি করে তার বিচার করবেন? এ বিচার তো ন্যায়বিচার হতে পারে না।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ইসলামী মূল্যবোধে বিশ্বাসীদের ধ্বংস করার জন্য এ বিচার চলছে। বিচারের নামে কেউ কেউ এদের ফাঁসিতে ঝোলানোরও স্বপ্ন দেখছে। তিনি বলেন, আগে আসল যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তার বিচার করুন, তারপর দেশীয়দের বিচারের কথা চিন্তা করা যাবে। মাহবুব হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ আজকের এই সেমিনার সম্পর্কে বলবে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাধাগ্রস্ত করার জন্য এ সমাবেশ করা হয়েছে। কিন্তু এখন আর সে সুযোগ নেই। কারণ ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি নিজামুল হক নাসিম গণতদন্ত কমিশনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং তা সবাই জেনে গেছে।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, জামায়াত এবং বিএনপির নেতারাসহ এদেশীয় লোকজন যখন যুদ্ধাপরাধের বিচারকে রাজনৈতিক বিচার হিসেবে আখ্যায়িত করে আসছে তখন সরকার বলেছে, আমরা যুদ্ধাপরাধ বিচারকে বানচাল করার জন্য এসব নাকি বলছি। কিন্তু এ বিচার যে সত্যিই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রতিপক্ষকে দমন করার জন্য করা হচ্ছে, তার পক্ষে শক্ত প্রমাণ রয়েছে। আজ সব আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় থেকে অভিযোগ করা হচ্ছে, এ বিচার রাজনৈতিক, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা উদ্দেশ্য নয়। গত ২১ জুন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত যে সাতজনকে যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে তার মধ্যে ৫ জনই জামায়াতে ইসলামীর নেতা এবং দু’জন বিএনপি নেতা। এতে এ ধারণার জন্ম নিচ্ছে যে, শুধু বিরোধী নেতাদের টার্গেট করার জন্যই এ বিচারের আয়োজন চলছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত বিশ্বখ্যাত সাপ্তাহিক ম্যাগাজিন ‘দি ইকোনমিস্ট’-এর চলতি সংখ্যার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা নয়, বরং বিরোধী ইসলামিক রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীকে ধ্বংস করার জন্যই ট্রাইব্যুনালকে ব্যবহার করা হচ্ছে।’
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, আপনাদের সাহস থাকলে ট্রাইব্যুনালে বিদেশি বিচারপতি, আইনজীবী এবং তদন্তকারী নিয়োগ দেন। আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, আপনাদের সে সাহস নেই, কারণ আপনারা মিথ্যার ওপর বিচার করছেন।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক আবারও চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলেন, সাহস থাকলে সংবিধানের প্রথম সংশোধনী বাতিল করুণ। কিন্তু আমি চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি আপনারা তা করতে পারবেন না। বিচারের সিআরপিসি প্রয়োগ না করার কারণে তিনি একে আনসিভিলাইজড হিসেবে উল্লেখ করেন।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, যেখানেই এ জাতীয় বিচার হয় সেখানেই আগে থেকেই অপরাধীদের তালিকা করা থাকে। কিন্তু আজ ৪০ বছর পরও নতুন করে লোকজনকে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। এক বছর আটক রাখার পরও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করতে পারে না। অথচ ৪০ বছর আগে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আন্তর্জাতিক একটি উদাহরণ টেনে ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক বলেন, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ জাতীয় অভিযোগে একজনকে গ্রেফতারের এক দিন পরই চার্জশিট প্রদান করা হয়।
সাদেক খান ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, এ বিচার করা হচ্ছে জামায়াত ধংস করার জন্য। আজ দেশে যা কিছুই করা হচ্ছে তার মূল উদ্দেশ্য হলো দেশকে অকার্যকর করা। অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদিন বিচারপতি নিজামুল হক নাসিমের ঘাতক-দালাল এবং গণতদন্ত কমিশনের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়ে বলেন, আপনার এ পদ গ্রহণ করা উচিত হয়নি। আপনি পদত্যাগ করে আবার হাইকোর্টে ফিরে আসুন।
তিনি বলেন, যিনি আইনের শাসনে বিশ্বাস করে না তিনি এখন আইনমন্ত্রী। তারা গোলাম আযমকে ফাঁসির রায় দিয়েছিলেন। তিনি এখন ঘাতক-দালালের নিজামুল হক নাসিমকে বানিয়েছেন ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান, যাতে গোলাম আযম ছাড়া বাকি যারা ছিলেন তাদেরও ফাঁসির ব্যবস্থা করতে পারেন।
ব্যারিস্টার বদরুদ্দোজা বাদল বলেন, হাইকোর্টের বিচারপতি শুধু হাইকোর্টের বিচার করবেন, এটি সংবিধানে বলা আছে। কিন্তু হাইকোর্টের বিচারপতিকে করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান। আবার নিজামুল হক নাসিম এটিএম ফজলে কবিরের চেয়ে ২৯ জন পরে ছিলেন সিরিয়ালের দিক দিয়ে, কিন্তু তার অধীনে এখন জুনিয়র হিসেবে কাজ করছেন ফজলে কবির। তিনি বলেন, এ ট্রাইব্যুনাল গুয়ান্তানামো কারাগারের চেয়েও খারাপ। সানাউল হক বলেন, আন্তর্জাতিক আদালতের ‘আও’ নেই এখানে। বিচারের নামে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করাই এর আসল কাজ

Thursday, 7 July 2011

অধিকারের রিপোর্ট : প্রতি ৪ দিনে একজন বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার













স্টাফ রিপোর্টার
চলতি বছরের গত ৬ মাসে গড়ে প্রতি ৪ দিনে একজন করে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। সীমান্তে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী-বিএসএফ ৬ মাসে ১৭ জন বাংলাদেশী নাগরিককে হত্যা করেছে। বিএসএফের আক্রমণে আহত হয়েছেন আরও ৪৯ জন বাংলাদেশী। মানুষ আইন হাতে তুলে নিয়ে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করেছে ৭৫ জনকে। এছাড়া ধর্ষণের শিকার হয়েছে ২৯৭ জন নারী ও শিশু। ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৫৪ জন। মানবাধিকার সংস্থা অধিকার গতকাল এক প্রতিবেদনে এই তথ্য প্রকাশ করেছে। অধিকারের তথ্য অনুযায়ী বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার ৩৭ জন ক্রসফায়ারে নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে র্যাব ২৪ জনকে, পুলিশ ৮ জনকে, র্যাব-পুলিশেরযৌথ অভিযানে ৩ জন এবং র্যাব ও কোস্টগার্ডের যৌথ অভিযানে ২ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে। নিহত ৪৯ জনের মধ্যে একজন আওয়ামী লীগ কর্মী, ৩ জন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (লাল পতাকা) সদস্য, ২ জন পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য, ৪ জন গণবাহিনীর সদস্য, ২ জন যুবক, একজন ৫২ বছর বয়সী ব্যক্তি, একজন ঢাকার নর্দান কলেজ প্রথম বর্ষের ছাত্র, একজন স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র, একজন ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, একজন ওষুধ ব্যবসায়ী, একজন কাপড়ের দোকান কর্মচারী, একজন পশু ডাক্তার, একজন শ্রমিক, একজন কয়েদি, ২ জন হাজতি এবং ২৬ জন কথিত অপরাধী বলে জানা গেছে।ধর্ষণের শিকার ২৯৭ জনের মধ্যে ১০৩ জন নারী এবং ১৯১ শিশু। ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছে ৩৫ জন নারী এবং ১৯ শিশু। ১৯৯৪ সালে দিনাজপুরে ইয়াসমিনকে ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের অভিযোগে মানবাধিকার সংস্থাগুলো দেশজুড়ে তোলপাড় করলেও রহস্যজনক কারণে এখন নীরব। ৬ মাসে ৫৪ জন ধর্ষণের পর হত্যাকাণ্ডের শিকার হলেও নারী সংগঠনগুলোর কোনো শব্দ নেই। সবাই এখন নীরবে এটা মেনে নিচ্ছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী ৬ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছে ৬৫ জন নাগরিক। প্রতিবেদনে র্যাব ধরে নিয়ে যাওয়ার পর নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর ৬২০, উত্তর শাহজাহানপুর এলাকা থেকে সাদা পোশাক ও ইউনিফর্ম পরা র্যাব সদস্যরা মুদি দোকান কর্মচারী রফিকুল ইসলামকে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর থেকে তার খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না বলে পরিবার অভিযোগ করেছে। নিখোঁজ রফিকুলের পরিবারের সদস্যরা অধিকারকে জানান, ধরে নিয়ে যাওয়ার পর তারা র্যাব-৩, স্থানীয় থানাসহ বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ নিয়েছেন, কিন্তু কোথাও পাওয়া যায়নি। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা অধিকারকে জানান, ঘটনার দিন বিকালে র্যাব-এর ইউনফর্ম পরা এবং সাদা পোশাকের ১৫/২০ জন সদস্য দোকান থেকে রফিকুলকে আটক করে নিয়ে যায়। কী অপরাধে তাকে আটক করা হয়েছে এ ব্যাপারে তারা কিছুই জানায়নি। দিনদুপুরে রফিকুলকে আটক করে নেয়ার এ দৃশ্য আশপাশের অন্যান্য দোকানদার, পথচারী ও সাধারণ মানুষ প্রত্যক্ষ করেছেন। রফিকুলের বাড়ি গাইবান্ধা জেলায়। গত ২২ ফেব্রুয়ারি স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তৌফিক আহমেদ হাসান নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের হিজবুত তাহ্রীর পোস্টারসহ অন্য দু’জনের সঙ্গে ধরা পড়েন। পুলিশের দায়েরকৃত এই মামলায় গত ১৩ মে তিনি জামিন পান। হাসানের বাবা মোহাম্মদ খবির উদ্দিন অভিযোগ করেছেন, পুলিশ ও কারারক্ষীদের সূত্রে তিনি জানতে পেরেছেন, সাদা পোশাকে র্যাব তার ছেলেকে জেল গেট থেকে জামিনে বের হয়ে আসার পর পরই অপহরণ করে।অধিকার এ ধরনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধার এবং এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের কাছে দাবি জানিয়েছে।
প্রতিবেদনে সভা-সমাবেশ, মানববন্ধন কর্মসূচি ও শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতেও পুলিশ বাধা দেয়ায় অধিকার গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে। এছাড়া হরতালের আগে ও হরতাল চলাকালীন পথচারীদের ধরে ভ্রাম্যমাণ আদালতে বিচারের নামে সাজা দেয়াকে অধিকার মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিমত প্রকাশ করেছে।

Wednesday, 29 June 2011

মানবাধিকারের রিপোর্ট : এক মাসে ২১ শিশু ধর্ষণের শিকার নিহত ৩

স্টাফ রিপোর্টার
গত মাসে সারা দেশে ২১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এদের মধ্যে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩ শিশুকে। আর এদের মধ্যে ৪ শিশুকে গণধর্ষণ করা হয়। শুধু শিশুই নয় ১১ জন নারীও ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গতকাল বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার (বিএসইএইচআর) এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে আরও উল্লেখ করা হয়, র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে ২ জন ও পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় একজন। এছাড়া পুলিশ হেফাজতে নিহত ৩ জন এবং আত্মহত্যা করেছে একজন। একই সময় জেলহাজতে মারা গেছে ৭ জন। বিএসএফের গুলিতে নিহত হয়েছে ৫ জন, নির্যাতনে আহত হয়েছে ৬ জন এবং অপহরণের শিকার হয়েছে একজন বাংলাদেশী।
গত মাসে সারা দেশে যৌতুকের জন্য প্রাণ দিতে হয়েছে ২৯ নারীকে। পারিবারিক কলহের কারণে নির্যাতিত হয়ে নিহত হয়েছে ৪১ জন এবং আহত হয়েছে ১০ নারী। এসিডদগ্ধ হয়েছে ১০ নারী। গত মাসে পাচারের সময় উদ্ধার হয়েছে ৬ নারী ও ৩ শিশু। সারা দেশে বিভিন্ন কারণে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় ২১ নারী ও ৮ পুরুষ।

Tuesday, 31 May 2011

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক রিপোর্ট প্রকাশ : বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সরকার ব্যর্থ : মাহমুদুর রহমানের ওপর নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে



বশীর আহমেদ
বর্তমান সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যা বন্ধের প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে। র্যাব এবং পুলিশ সদস্যরা অযৌক্তিকভাবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের আটক করছে। আমার দেশ সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের ওপর চালানো হয়েছে নির্মম নির্যাতন। বাংলাদেশে নারীদের বিরুদ্ধে ধর্ষণসহ নানা ধরনের সহিংসতা চলছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বার্ষিক প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।
গতকাল লন্ডনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ‘দি স্টেট অব দি ওয়ার্ল্ডস হিউম্যান রাইটস’ শীর্ষক এই রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়।
রিপোর্টে এশিয়া প্যাসিফিক চ্যাপ্টারে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তুলে ধরে বলা হয়, সরকার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বন্ধের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়েছে।
বাংলাদেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী ২০১০ সালের প্রথম ১০ মাসে র্যাব এবং পুলিশের হাতে ৬০ জনেরও বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যার উদাহরণ দিয়ে রিপোর্টে বলা হয়, গত জুলাই মাসে কুষ্টিয়া জেলার কোনাবাড়িয়া গ্রামের আবদুল আলীমকে পুলিশ সবার সামনে আটক করে। পরের দিন সকালে তার গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ পাওয়া যায়। পরে পুলিশ দাবি করে আবদুল আলীমকে গ্রেফতার করতে গেলে সে প্রতিরোধ করে এবং নিহত হয়। আলীমের পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো সুবিচার পাওয়া যায়নি।
বন্দি নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমানকে গত বছর ২ জুন আটক করা হয় এই অভিযোগ এনে যে, তিনি বৈধ লাইসেন্স ছাড়া পত্রিকা চালাচ্ছেন। আটক অবস্থায় মাহমুদুর রহমানকে পুলিশ নির্মমভাবে প্রহার করেছে। মাহমুদুর রহমান আদালতে তার ওপর চালানো নির্যাতনের বর্ণনা দেন।
রিপোর্টে বলা হয়, আটক অবস্থায় নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতনে গত বছর অন্তত ৬ জন মারা গেছে। এসব ঘটনা নিয়ে পুলিশি তদন্ত হলেও এখন পর্যন্ত দায়ীদের কাউকে বিচারের মুখোমুখি করা হয়নি। আটক অবস্থায় গর্ভবতী গার্মেন্ট শ্রমিকরাও নিরাপত্তা বাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পায়নি বলে রিপোর্টে বলা হয়েছে।
মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগের প্রসঙ্গ তুলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, র্যাব এবং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ওপর বেপরোয়া শক্তি প্রয়োগ করছে। তারা বিএনপি নেতা এবং সাবেক মেয়র মির্জা আব্বাসের বাড়িতে হরতালের আগের রাতে হামলা চালায়। ওই হামলায় অন্তত ২০ জন আহত হয়। আহতদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল নারী।
অযৌক্তিকভাবে গ্রেফতার এবং ডিটেনশনের কথা উল্লেখ করে অ্যামনেস্টির রিপোর্টে বলা হয়, র্যাব ও পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালনকালে দেড় হাজারের বেশি মানুষকে নির্বিচারে আটক করে। ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল এবং বিভিন্ন সমাবেশ থেকে তাদের আটক করা হয়। এদের অনেকের বিরুদ্ধে আনা হয় ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ। ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাঝে ছাত্রশিবিরের অন্তত ৩০০ সদস্যকে আটক করা হয়। জুন মাসে বিএনপির ২০ নেতাসহ আটক করা হয় ২০০ জনকে।
যুদ্ধপরাধের বিচার প্রসঙ্গে রিপোর্টে বলা হয়, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য বাংলাদেশ সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করেছে। সরকার বিএনপি নেতা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী, জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, মো. কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতার করে তাদের এখন মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের সঙ্গে যুক্ত বলে দেখানো হচ্ছে। তবে তাদের গ্রেফতার করা হয় অন্য অভিযোগে। মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারের জন্য যুদ্ধাপরাধ বিচার আইন ১৯৭৩ গত ২০০৯ সালে সংশোধন করা হয়েছে। বিদ্যমান এই আইনে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে।
নারীর প্রতি সহিংসতার চিত্র তুলে ধরে রিপোর্টে বল হয়, নারীর প্রতি সহিংসতার ৭ হাজার ২৮৫টি অভিযোগ পুলিশের কাছে এসেছে ২০১০ সালের প্রথম ৬ মাসে। এর মধ্যে ধর্ষণের অভিযোগ ছিল ১ হাজার ৫৮৬টি

সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন জে র্যাপ : যুদ্ধাপরাধের বিচারে সহায়তা পেতে আইন সংশোধন করতে হবে















কূটনৈতিক রিপোর্টার

যুদ্ধাপরাধবিষয়ক মার্কিন অ্যাম্বাসাডর অ্যাট লার্জ স্টিফেন জে র্যাপ বলেন, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের বিচারে মার্কিন সহায়তা পেতে হলে বিদ্যমান আইন সংশোধন করতে হবে।
তিন দিনের সফর শেষে ঢাকা ছাড়ার আগে গতকাল রাজধানীর আমেরিকান ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এই মন্তব্য করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মার্কিন এই বিশেষ দূত বলেন, গত জানুয়ারিতে ঢাকা সফরের সময়ে বাংলাদেশের যুদ্ধা-পরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করতে আমি বেশকিছু সুপারিশ সরকারকে দিয়েছিলাম। এবারের সফরে এসে সেসব বিষয়ে আইনমন্ত্রী এবং ট্রাইব্যুনালের সঙ্গে আলোচনা করেছি। তাদের এ ব্যাপারে আন্তরিক বলেই মনে হয়েছে। তারা আমাকে আশ্বস্ত করেছেন, বিদ্যমান বিধিতে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হবে। তিনি বলেন, আমি তাদের জানিয়েছি, এই বিধি সংশোধনের জন্য সংসদের প্রয়োজন নেই। সরকার এবং বিচারকরা রুলস অব বিজনেস পরিবর্তন করে তা করতে পারেন। পরিবর্তিত বিধি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের আইসিসি আইনের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ হতে হবে, যাতে আন্তর্জাতিক মান নিশ্চিত করা যায়।
যুদ্ধাপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় মার্কিন সহায়তার বিষয়ে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্টিফেন র্যাপ বলেন, আমাদের সুপারিশ অনুযায়ী আগে বিদ্যমান বিধির সংশোধন করতে হবে। এই সংশোধনের মাধ্যমে বিদ্যমান বিধি যদি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হয়, তাহলেই কেবল আমি বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধের বিচারে সহায়তার জন্য কংগ্রেসকে অনুরোধ জানাতে পারব। তিনি বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ট্রাইব্যুনালের বিচারক, তদন্ত কর্মকর্তা এবং আইনজীবীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে সহায়তা করতে পারে।
যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগপত্র দাখিল না করে মাসের পর মাস আটকে রাখা হচ্ছে—এ ব্যাপারে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে র্যাপ বলেন, তাদের জামিনের বিষয়টি ট্রাইব্যুনাল বিবেচনা করতে পারে। তবে জামিন দেয়া-না দেয়ার বিষয়টি তাদের এখতিয়ার। বিচারকরা এ ব্যাপারে মাসে মাসে পর্যালোচনা করতে পারেন। সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আসামি এবং বাদী উভয়পক্ষের সাক্ষীদের নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিকভাবে নিরাপত্তার জন্য সাক্ষীদের নাম-ঠিকানা গোপন রাখা যেতে পারে। তবে একটি পর্যায়ে এসে তা অবশ্যই জনসাধারণকে জানাতে হবে। কারণ তা না হলে বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। সাংবাদিকদের অন্য এক প্রশ্নের জবাবে মার্কিন দূত বলেন, এই বিচার প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসময় লাগতে পারে। তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করা, অভিযোগ দায়ের করা, সাক্ষ্য গ্রহণ, আইনজীবীদের যুক্তি-পাল্টা যুক্তি উপস্থাপনসহ রায়ের পর সুপ্রিমকোর্টে আপিল—সব মিলিয়ে এটা একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। তাই এই বিচার প্রক্রিয়া শেষ করতে যদি কোনো পলিটিক্যাল ক্যালেন্ডার শেষ হয়ে যায় তাহলেও যেন বিচার প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকে।
সংবাদ সম্মেলনে স্টিফেন জে র্যাপ আরও বলেন, মানুষের নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সংরক্ষণবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে স্বাক্ষর করেছে বাংলাদেশ। তাই এই বিচার প্রক্রিয়ায় যাতে কারও নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার লঙ্ঘন না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

Tuesday, 26 April 2011

সেমিনারে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক : সর্বোচ্চ আদালতের বিচার প্রক্রিয়ায় মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে











কূটনৈতিক রিপোর্টার
বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার রফিক-উল হক বলেছেন, বর্তমানে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকাজে অনেক ক্ষেত্রে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে। বিচারকরা যে রায় দিচ্ছেন, তা বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে রায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবে হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেসি কাউন্সিল আয়োজিত ‘মানবাধিকার লঙ্ঘন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ’ শীর্ষক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এই মন্তব্য করেন। দৈনিক আমার দেশ-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, বিএনপি চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা ও সাবেক মন্ত্রী আবদুল মান্নান, জাতীয় প্রেস ক্লাবের সাবেক সভাপতি ও বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের মহাসচিব শওকত মাহমুদ, হিউম্যান রাইটস অ্যাডভোকেসি কাউন্সিলের সভাপতি ব্যারিস্টার নাসির উদ্দিন আহমেদ অসীম, সাংবাদিক অলিউল্লাহ নোমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
সেমিনারে বাংলাদেশে ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
ব্যারিস্টার রফিক-উল হক তার বক্তৃতায় বলেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিচারকরা তাদের ইচ্ছেমত সুয়োমোটো রুল দিচ্ছেন তথাকথিত জনস্বার্থের কথা বলে। তাদের রায়গুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, সেখানে অনেক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে।
আদালত অবমাননার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, মাহমুদুর রহমানকে ৬ মাসের জেল এবং ১ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছিল অথচ রায়ে বিচারকরা বলতে পারেননি কীভাবে আদালত অবমাননা হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, মাহমুদুর রহমানের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ বা দেহভঙ্গি ভালো ছিল না। আবার একই ধরনের অন্য মামলায় একশ’ টাকা জরিমানা অনাদায়ে একদিনের জেল। এই হলো আদালতের অবস্থা। তিনি আরও বলেন, এখন সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে বিচারকরা খুব বলছেন। আবার সামরিক শাসন যদি এসে যায়, প্রথমেই এই বিচারকরা বঙ্গভবনে হাজির হবেন শপথ পড়ানোর জন্য। তিনি দুই নেত্রীসহ সবার প্রতি সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, একে অন্যকে কথার মাধ্যমে অপমান করাও মানবাধিকারের লঙ্ঘন। সবার উচিত সহনশীল হওয়া। কখন কাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে তা কেউ জানেন না।
নতুন প্রজন্মের মধ্যে মানবাধিকার বিষয়ে সচেতনতা বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, এই সমাজে এখন কেউ নিরাপদ নয়। সরকার সংবিধান তছনছ করে মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে। দলীয় লোক এবং পুলিশ দিয়ে চরমভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করা হচ্ছে। এখন সময় এসেছে প্রতিরোধের। তিনি বলেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষা না হলে মানবাধিকার রক্ষা হবে না। বাংলাদেশে সরকার যেভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে, তা কোনো সভ্য সমাজে চলতে পারে না।
সভাপতির বক্তৃতায় মাহমুদুর রহমান বলেন, বর্তমান সরকার মানবাধিকারে বিশ্বাস করে না। তারা মানবাধিকারে বিশ্বাস করে না বলেই নিজেরা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং পার্শ্ববর্তী রাষ্ট্র যখন এদেশের নিরীহ মানুষদের গুলি করে হত্যা করছে, তখন তার প্রতিবাদ করে না। তিনি বলেন, ১/১১-এর সরকারের সময় যাদের আত্মীয়-পরিজনদের ব্যারিস্টার রফিক-উল হকের চেম্বারে পড়ে পড়ে কাঁদতে দেখেছি, আজ তারাই মানবাধিকার লঙ্ঘনে লিপ্ত হয়েছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক। আজ যারা মানবাধিকার লঙ্ঘন করছেন, তাদের মানবাধিকার রক্ষার জন্য সেই কঠিন দিনগুলোতে ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আইনের মাধ্যমে আর আমি কলমের মাধ্যমে লড়াই করেছি। তিনি বিএনপির উদ্দেশে বলেন, আপনারা যদি ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যান, তখন মানবাধিকার রক্ষার বিষয়টিকে একটি আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করবেন—এটাই আমাদের প্রত্যাশা। ক্ষমতায় এসে প্রতিশোধ গ্রহণ করব—এই চিন্তা যেন না থাকে। তিনি নিজের প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, আমি প্রতিহিংসায় বিশ্বাস করি না। আগামী দিনগুলোতে যদি মানবাধিকার লঙ্ঘনমুক্ত একটি দেশ আমরা পাই, তা হলে আমার ওপর যে নির্যাতন হয়েছে সেই নির্যাতনের কষ্ট ভুলে যাব। মানবাধিকারের প্রশ্নে আমরা সবাই যদি দল-মত নির্বিশেষে একত্রে দাঁড়াতে পারি, তাহলে সেটাই হবে সবচেয়ে বড় অর্জন।
নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করে শওকত মাহমুদ তার বক্তৃতায় বলেন, সরকার যখন উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে, তখন তার নিরাপত্তা বাহিনীও উচ্ছৃঙ্খল আচরণ করে। বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সরকার যেভাবে সমর্থন জোগাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। হুমকির মুখে পড়েছে আমাদের জাতিরাষ্ট্রের অস্তিত্ব। তিনি বলেন, দেশে এখন একটি আতঙ্কজনক পরিস্থিতি চলছে। আদালতের দায়িত্ব তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে জনগণের মৌলিক অধিকার রক্ষা করা। সেখানে আদালত যদি তার ক্ষমতা ব্যবহার করে সাংবাদিকদের শাস্তি দিতে তত্পর হন, সেক্ষেত্রে আমাদের আতঙ্কিত হতে হয়

ক্রসফায়ার থেকে বেঁচে আসা ২ যুবকের লোমহর্ষক কাহিনী : র্যাব বিলুপ্তির দাবি এএইচআরসির












বশীর আহমেদ

নিরপরাধ ব্যক্তিদের ধরে নিয়ে নিষ্ঠুর এবং বর্বর নির্যাতন চালাচ্ছে র্যাব। র্যাবের নির্যাতনের এই ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন (এএইচআরসি)। গত ২০ এপ্রিল প্রকাশিত কমিশনের এক রিপোর্টে র্যাব সদস্যদের নির্যাতনের দুটি কেস স্টাডি তুলে ধরা হয়েছে। কেস স্টাডিতে রাজীব এবং সজীব নামে পুরান ঢাকার দুই যুবকের ওপর চালানো নির্মম নির্যাতন এবং ক্রসফায়ার থেকে তাদের বেঁচে যাওয়ার লোমহর্ষক কাহিনী তুলে ধরা হয়েছে। এ সম্পর্কে র্যাবের পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) কমান্ডার সোয়াহেলের প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে তিনি বলেন, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের রিপোর্টটি আমাদের হাতে আসেনি। আমরা এ ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করব না।
রিপোর্টটিতে বলা হয়, নাহিদুল হক সজীব, বয়স ২৫। লালবাগ থানার অধীন চাঁনখারপুল এলাকায় তার ঘর। সে পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। গত ৫ এপ্রিল রাত সাড়ে ৯টার দিকে কিছু কেনাকাটার জন্য ঘর থেকে বের হয় সজীব। পাশেই তার ব্যবসা অফিস। অফিসের কাছাকাছি এলেই একদল র্যাব সদস্য সজীবকে থামায়। র্যাব সদস্যরা সজীবের কাছে তার নাম, সে কি করে এগুলো জানতে চায়। সজীব তার নাম এবং ব্যবসার কথা বলার পর এক র্যাব সদস্য সজীবকে বলে ‘তুই একজন ছিনতাইকারী।’ একথা বলার সঙ্গে সঙ্গে র্যাব সদস্যরা তার চোখ বেঁধে ফেলে গাড়িতে তোলে। চোখ বাঁধার পর তার মুখের ওপর আরও একটি মাস্ক পরিয়ে দেয়া হয়। সজীবকে নিয়ে যাওয়া হয় লালবাগ কেল্লার পাশে অবস্থিত র্যাব-১০-এর ক্যাম্পে। মুখোশ পরিয়ে হ্যান্ডকাফ লাগিয়ে ক্যাম্পের দোতলার একটি সেলে সজীবকে রাখা হয়। গভীর রাতে জিজ্ঞাসাবাদের নামে শুরু হয় তার ওপর নির্যাতন। সেল থেকে কয়েক গজ দূরে পাশের আরেকটি রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একজন র্যাব কর্মকর্তা তার এবং তার বাবার নাম জানতে চান। সজীব উত্তর দেয়ার পর ওই কর্মকর্তা বলেন, আমি তোকেই খুঁজছি। এ কথা বলেই ওই কর্মকর্তা একটি লাঠি দিয়ে সজীবকে পায়ের তলায়, পিঠে ও কাঁধে বেধড়ক পেটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে সজীব অজ্ঞান হয়ে পড়ে। পরে র্যাবেরই একজন ডাক্তার এসে তাকে চিকিত্সা দেন। সজীবের জ্ঞান ফেরার পর র্যাব সদস্যরা তাকে এক প্যাক জুস খেতে দেয়। রাতে র্যাব সদস্যরা সজীবের পায়ের আঙ্গুলের সঙ্গে হ্যাসকে ট্যাগ লাগিয়ে বারবার ইলেকট্রিক শক দেয়। তবে তাকে রাতে আলু ভর্তা দিয়ে ভাত খেতে দেয়া হয়।
৬ এপ্রিল বেলা আড়াইটায় সজীবকে জানানো হয় র্যাবের একজন বড় কর্মকর্তা এসেছেন। সজীবকে ওই কর্মকর্তার সামনে হাজির করা হয়। ওই কর্মকর্তা তার অধস্তন কর্মকর্তাদের কাছে সজীবের গ্রেফতারের ব্যাপারে জানতে চান। জুনিয়র র্যাব কর্মকর্তারা জানান, সন্দেহ করে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং তথ্য বের করার চেষ্টা হচ্ছে। এ সময় ওই কর্মকর্তা বলেন, ঠিক আছে তথ্য বের করে রিপোর্ট তৈরি কর। প্রয়োজন হলে আরও পেটাবে।
এরপর সজীবকে অন্য একটি রুমে নেয়া হয়, সেখানে একজন ডাক্তার তাকে আবার পরীক্ষা করেন।
৭ এপ্রিল রাত ৩টায় র্যাব সদস্যরা সজীবকে অন্য একটি রুমে নিয়ে যায়। সেখানে তারা দীর্ঘ সময় ধরে নানাভাবে সজীবের ওপর নির্যাতন চালায়। তার আঙ্গুলে সূচ ঢোকানো হয়। ধারালো ধাতব ব্লেড দিয়ে সজীবের নখ কেটে ফেলা হয়। এরপর ওই নখের ওপর এক ধরনের স্প্রে করা হয়, যাতে আঘাতের চিহ্ন বোঝা না যায়। কয়েক দিন পরে সজীবের পায়ের তলায় অস্ত্রের বাঁট দিয়ে নির্মমভাবে পেটানো হয়। এখানেই নির্যাতনের শেষ নয়, র্যাব সদস্যরা সজীবের কানের মধ্যে শক্ত কাঠি ঢুকিয়ে দেয়। এ সময় সজীবের কান দিয়ে রক্ত পড়তে থাকে। এই নির্যাতনের মধ্যে সজীব জানতে চায় কি তার অপরাধ। তার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে র্যাব সদস্যরা আরও নির্যাতন চালায়।
৮ এপ্রিল রাত আড়াইটায় নতুন ৩ র্যাব সদস্য সজীবকে যেখানে আটক রাখা হয়েছে সেখানে আসে। তারা এসেই সজীবকে উপর্যুপরি লাথি মারতে থাকে। পরে মেঝেতে ফেলে বুট দিয়ে নির্মমভাবে পাড়াতে থাকে। সজীব অজ্ঞান হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নির্যাতন চলতে থাকে।
৮ এপ্রিল রাতে র্যাব সদস্যরা সজীবের কাছে এসে বলে অজু করে আয়। পরে তাকে সূরা ইয়াসিন এবং সূরা আর-রাহমানের কয়েকটা আয়াত দিয়ে তা পাঠ করতে বলে। সজীব তখন বারবার ওই আয়াতগুলো পড়তে থাকে। সজীবকে আটকের একদিন পর অর্থাত্ ৬ এপ্রিল হোসনি দালান এলাকা থেকে র্যাব সদস্যরা আটক করে কাওসার হোসেন রাজীবকে। রাজীবের বয়স ২৪। প্লাস্টিকের বোতলের ব্যবসা তার। রাজীব ও সজীব সম্পর্কে কাজিন।
তখন রাত আনুমানিক ৮টা। রাজীব তার বাবা আওলাদ হোসেনের সঙ্গে মসজিদে নামাজ পড়তে যাচ্ছিল। পথে সাদা পোশাকে ৮ জনের র্যাবের একটি দল রাজীবকে থামায়। র্যাব সদস্যরা রাজীবকে বলে তাকে তাদের সঙ্গে যেতে হবে। রাজীব এ সময় জানতে চায় তার অপরাধ কী। তখন র্যাব সদস্যরা বলেন একদম চুপ।
রাজীবের বাবা আওলাদ হোসেন এবং ছোট ভাই রনি এ সময় এগিয়ে এসে জানতে চায় কেন রাজীবকে তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এ সময় উত্তেজিত র্যাব সদস্যরা অস্ত্র বের করে বলে কথা বললে গুলি করে মেরে ফেলব। এরপর র্যাব সদস্যরা রাজীবের চোখ এবং মুখ কালো কাপড় দিয়ে বেঁধে একটি মাইক্রোবাসে করে র্যাব-১০-এর লালবাগ কেল্লার পাশে অবস্থিত ক্যাম্পে নিয়ে যায়। চোখ-মুখ বাঁধা অবস্থায় রাজীবকে প্রায় ১ ঘণ্টা বসিয়ে রাখা হয়। এরপর রাজীবকে র্যাবের এক সিনিয়র কর্মকর্তার রুমে নিয়ে যাওয়া হয়। একটি চেয়ারে তাকে চোখ-মুখ বাঁধা অবস্থায় বসানো হয়। এ সময় তার পেছনে বাঁধা হয়। পা দুটি রাখা হয় অন্য একটি চেয়ারের ওপর। হকিস্টিক দিয়ে র্যাব সদস্যরা তার পায়ের তলায় নির্মমভাবে পেটাতে শুরু করে। এরপর আঙুলে লোহার ক্লিপ লাগিয়ে বারবার ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। প্রায় ১ ঘণ্টা চলে এই নির্যাতন। নির্যাতনের পর তাকে রুমে নিয়ে আসা হয়। তাকে রাতের বেঁচে যাওয়া কিছু খাবার খেতে দেয়া হয়, যা খাওয়ার উপযুক্ত ছিল না। আধ ঘণ্টা পর রাজীবকে আবার অন্য একটি রুমে নেয়া হয়। এ সময় নির্যাতন আর আঘাতের কারণে রাজীব কাঁপছিল। সে হাঁটতে পারছিল না। তখন র্যাব সদস্যরা তাকে হাঁটতে বলে। রাজীব জানায়, তার পায়ে প্রচণ্ড যন্ত্রণা হচ্ছে। নির্যাতনকারী র্যাব সদস্যরা এখন যন্ত্রণা আরও বাড়িয়ে দেব এই কথা বলে আবার পেটাতে শুরু করে। রাজীবের আঙুল এবং নখের মধ্যে সূই ঢুকিয়ে দেয়। রুমের মেঝেতে পড়ে থাকে রাজীব। নিষ্ঠুর র্যাব সদস্যরা এ সময় রাজীবকে আবার ওঠে দাঁড়াতে বলে। রাজীব জানায়, তার দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই। এরপর রাজীবের শরীরের কয়েকটি ধাতব পাত জড়িয়ে ইলেকট্রিক শক দেয়া হয়। ইলেকট্রিক শকে রাজীব দূরে ছিটকে পড়ে। র্যাব সদস্যরা তখন বলে, তুই নাকি দাঁড়াতে পারবি না, এখন দেখলি তো তুই লাফাতেও পারিস।
এভাবে নির্যাতন চালিয়ে র্যাব-১০-এর সদস্যরা রাজীবকে তাদের নির্দেশমত স্বীকারোক্তি দিতে বলে। আর স্বীকারোক্তি না দিলে তাকে ক্রসফায়ারে মেরে ফেলার হুমকি দেয়া হয়। ৭ এপ্রিল রাজীবকে নিয়ে র্যাব সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায় এবং ক্রসফায়ারে মারার ভয় দেখিয়ে স্বীকারোক্তি আদায়ের চেষ্টা করে। র্যাব সদস্যরা বারবার বলে তুই একজন ছিনতাইকারী।
৮ এপ্রিল মধ্যরাতে র্যাব সদস্যরা রাজীব এবং সজীবকে চোখ-মুখ বেঁধে একটি গাড়িতে করে আজিমপুর এলাকার দিকে যায়। গাড়ির মধ্যে যখন তাদের চোখ-মুখ খুলে দেয়া হয়, তখন তারা একে অন্যকে চিনতে পারে এবং একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। এ সময় তাদের ওপর আবার নির্যাতন চালানো হয়। সজীব এবং রাজীবকে নিয়ে র্যাব সদস্যরা বিভিন্ন স্থানে ঘুরে বেড়ায়। এক পর্যায়ে তাদের ক্রসফায়ারে মারার জন্য বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে সোয়ারীঘাট এলাকায় নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় র্যাবের সঙ্গে পুলিশ এবং অন্যান্য এজেন্সির সদস্যরাও ছিল। র্যাব কর্মকর্তারা এ সময় রাজীব এবং সজীবকে দৌড়াতে বলে। কিন্তু তারা দৌড়াতে অস্বীকৃতি জানায়। তারা জানে দৌড়ালে তাদের গুলি করা হবে। রাজীব এবং সজীব এক র্যাব কর্মকর্তার পা জড়িয়ে ধরে আকুতি জানায়, আমাদের মারবেন না। আমাদের ক্যাম্পে নিয়ে চলুন। এ সময় আজিমপুর স্টাফ কোয়ার্টার থেকে দু’জন গার্ডকে নিয়ে আসা হয়েছিল, যারা র্যাবের নির্দেশে রাজীব এবং সজীবকে ছিনতাইকারী হিসেবে সাক্ষ্য দিয়ে একটি কাগজে সই করে। এরই মধ্যে সকাল হয়ে আসে। র্যাব সদস্যরা ওই রাতে রাজীব এবং সজীবকে না মেরে ফেরত নিয়ে যায়। র্যাবের এক কর্মকর্তা তাদের বলেন, তোদের মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত ছিল। হয়তো জীবনে কোনো ভালো কাজ করেছিলি তাই বেঁচে গেলি। নিয়মিত নামাজ পড়বি।
৯ এপ্রিল সকালবেলা র্যাব-১০-এর ক্যাম্পে সজীব এবং রাজীবকে নিয়ে যাওয়ার পর এক পর্যায়ে পায়ে গুরুতর আঘাতপ্রাপ্ত রাজীবকে মিটফোর্ড হাসপাতালে নেয়া হয়। সজীবকে হাজির করা হয় র্যাবের এক সিনিয়র কর্মকর্তার রুমে। ওই কর্মকর্তা উত্তেজিত কণ্ঠে গালাগাল দিয়ে বলেন, মন্ত্রী-এমপি দিয়ে ফোন করিয়ে ক্ষমতা দেখাস। যা বেঁচে গেলি বলে তিনি সজীবকে পেটাতে থাকেন। এক পর্যায়ে বলেন, আমরা আমাদের ক্ষমতা দেখালাম। এরপর ছিনতাই মামলা দিয়ে দু’জনকে চালান করে দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন র্যাব কর্মকর্তা। বিকেলের দিকে হাসপাতাল থেকে রাজীবকে ফিরিয়ে আনা হয়। সজীব ও রাজীব দুজনের বুকে নাম লিখে সামনের টেবিলে দুটি ছুরি রেখে ছবি তোলা হয়। এরপর লালবাগ থানায় নিয়ে ছিনতাইকারি বলে দ্রুত বিচার আইনে মামলা রুজু করতে বললে ডিউটি অফিসার প্রথমে অপারগতা জানান। তার যুক্তি, ছিনতাই করেনি- করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এ কারণে দ্রুত বিচার আইনে মামলা হয় না। ছিনতাই করলে ছিনতাইকৃত মালামালের দরকার। তখন র্যাব কর্মকর্তা সজীব ও রাজীবকে আটকের সময় তাদের কাছে থাকা মোবাইল এবং টাকা ছিনতাইকৃত বলে উল্লেখ করে মামলা দায়ের করতে বলেন। এক পর্যায়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ডিউটি অফিসার কথা বলেন এবং মামলা রুজু করেন। ১০ এপ্রিল সজীব ও রাজীবকে কোর্টে চালান দেয় পুলিশ। কোর্টে তাদের জামিনের আবেদন মঞ্জুর হয়। র্যাব সদস্যরা পুলিশের হাতে তাদের তুলে দেয়ার আগে শাসিয়ে দেয় নির্যাতনের কাহিনী কোথাও প্রকাশ করলে তাদের মেরে ফেলা হবে। কিন্তু জীবনের মায়া উপেক্ষা করেই মানবাধিকার কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেন সজীব ও রাজীব। তারা জানান, মুক্ত হওয়ার পরও তাদের হুমকি দেয়া হচ্ছে টেলিফোনে।
এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশনের পক্ষ থেকে র্যাবের এই বর্বর অপরাধের তদন্ত করে দোষীদের শাস্তির পাশাপাশি অবিলম্বে র্যাব বিলুপ্ত করার দাবি জানানো হয়।